একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম জাতির আত্মপ্রকাশ ঘটে কেবল মানচিত্রে সীমানা নির্ধারণের মাধ্যমে নয়, বরং তার চিন্তা ও দর্শনের স্বাধীনতায়। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, বিশ্ব যখন চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এবং মহাকাশ বিজ্ঞান নিয়ে ভবিষ্যতের পথে ছুটছে, তখন আমাদের সমাজ ও রাজনীতির একটি বড় অংশ এখনো ১৯৪৭ বা ১৯৭১ পূর্ববর্তী ঐতিহাসিক বিতর্ক এবং ভিন্ন দেশের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের নিয়ে অতি-উৎসাহী। এই ক্ষতিকর ও পশ্চাৎপদ মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে বাংলাদেশ কীভাবে একটি জ্ঞানভিত্তিক ও উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে, তা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
১. অতীতমুখীতা ও পরমুখাপেক্ষিতা পরিহার
ইতিহাস আমাদের শেকড়, কিন্তু তা যেন কখনো ভবিষ্যৎ যাত্রার বেড়ি না হয়। জিন্নাহ, নেহেরু বা গান্ধী উপমহাদেশের ইতিহাসের অংশ হলেও তারা আমাদের বর্তমান বা ভবিষ্যতের চালিকাশক্তি নন। তরুণ প্রজন্মের মেধা ও শক্তি ব্যয় হওয়া উচিত নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনে, কোনো মৃত রাজনৈতিক তত্ত্বের বিশ্লেষণে নয়। একইভাবে, দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ‘ভারতপন্থী’ বা ‘পাকিস্তানপন্থী’ ট্যাগিংয়ের সংস্কৃতি একটি স্বাধীন জাতির মানসিক দৈন্য প্রকাশ করে। বিশ্বের প্রতিটি দেশ যেমন তাদের জাতীয় স্বার্থকে সবার ওপরে রাখে, আমাদেরও একমাত্র নীতি হওয়া উচিত—‘বাংলাদেশপন্থী’। বিনা কারণে কোনো দেশের সাথে বৈরিতা নয়, তবে বন্ধুত্ব হতে হবে পারস্পরিক সমতা ও দেশের স্বার্থ সুরক্ষার ভিত্তিতে।
২. বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর বৈশ্বিক অবস্থান
উন্নত বিশ্ব যখন চন্দ্র-মঙ্গল অভিযান কিংবা হাইড্রোজেন শক্তির টেকসই ব্যবহারে ব্যস্ত, তখন আমাদের টিকে থাকতে হলে সক্ষমতা বাড়াতে হবে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে। মুখস্থবিদ্যা এবং কেরানি তৈরির পুরনো শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে সরে এসে এসটিইএম (STEM) শিক্ষায় পূর্ণ জোর দিতে হবে। পাশাপাশি, এসপারসো (SPARRSO) বা পরমাণু শক্তি কমিশনের মতো গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আমলাতান্ত্রিক জটিলতামুক্ত করে বিজ্ঞানীদের উপযুক্ত পরিবেশ ও অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে। গবেষণায় পর্যাপ্ত বরাদ্দ ছাড়া কোনো জাতি বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকতে পারে না।
৩. টেকসই উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি
দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য নীতিনির্ধারক ও বুদ্ধিজীবী মহলের আলোচনা এবং পরিকল্পনা হতে হবে সুনির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে কেন্দ্রীভূত:
অর্থনৈতিক বহুমুখীকরণ: শুধু তৈরি পোশাক শিল্পের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে তথ্যপ্রযুক্তি (IT), সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন, ফ্রিল্যান্সিং এবং জাহাজ নির্মাণ শিল্পের মতো উচ্চ-মূল্যের খাতে মনোযোগ দিতে হবে।
মানবসম্পদ উন্নয়ন: বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীকে (Demographic Dividend) আধুনিক প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) শিক্ষায় দক্ষ করে না তুললে এই জনশক্তি একসময় বোঝায় পরিণত হবে।
জলবায়ু ও খাদ্য নিরাপত্তা: জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় ডেল্টা প্ল্যান-২১০০ এর সঠিক বাস্তবায়ন, লবণাক্ততা-সহিষ্ণু ফসল উৎপাদন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে।
৪. মানসিকতা পরিবর্তনে গণমাধ্যম ও নেতৃত্বের ভূমিকা
এই রূপান্তরের যাত্রায় গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক নেতৃত্বকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। টকশো বা সংবাদপত্রে সস্তা রাজনৈতিক কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি বাদ দিয়ে দেশের কৃষি, উদ্ভাবন, স্টার্ট-আপ এবং তরুণদের সফলতার গল্পগুলোকে মূলধারায় আনতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর এজেন্ডায় ভূ-রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের চেয়ে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, আইনের শাসন ও নাগরিক সুযোগ-সুবিধা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত।
শেষ কথা
ইতিহাসকে সম্মান করা এবং তা থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি, তবে ইতিহাসের খাঁচায় বন্দি থাকা আত্মঘাতী। বিশ্ব যখন নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ায় ব্যস্ত, তখন নিজেদের অতীত ও প্রতিবেশীদের নিয়ে মারামারি করলে আমরা প্রতিযোগিতায় পেছনে পড়ে যাব। আমাদের একমাত্র পরিচয় হোক—আমরা বাংলাদেশি, এবং আমাদের একমাত্র লক্ষ্য হোক—একটি জ্ঞানভিত্তিক, সমৃদ্ধ ও আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার।
