PRB Post

২৪ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:৫৮ AM • মতামত

কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে পর্যটকদের নিরাপত্তায় চাই সমন্বিত ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা

PRB Post

২৪ অক্টোবর, ২০২৬ এ ১২:৫৮ AM • 3 মিনিট পড়া

অ্যাডভোকেট মোস্তফা মাহমুদ আরিফি

কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে পর্যটকদের নিরাপত্তায় চাই সমন্বিত ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা

অ্যাডভোকেট মোস্তফা মাহমুদ আরিফি | ছবি : পিআরবি গ্রাফিক্স

 

বাংলাদেশের প্রধানতম পর্যটনকেন্দ্র হচ্ছে কক্সবাজার। প্রতিদিন হাজার হাজার পর্যটক এখানে আসেন বিনোদনের জন্য। নানা সীমাবদ্ধতার পরও মানুষ সাগরমুখী হন এবং সৈকতে অবগাহন করেন। কিন্তু ইদানীং প্রায়ই দেখা যায়, সৈকতে নামার পর সাগরের প্রবল ঢেউয়ের ফলে মানুষ নিখোঁজ হয়ে যান। পরবর্তী সময়ে তাঁদের লাশ ভেসে ওঠে।

এই অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য আমাদের একটি সমন্বিত ও প্রযুক্তিগত নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। বিশ্বের দীর্ঘতম এই সমুদ্রসৈকতে পর্যটকদের জীবন রক্ষায় কিছু কার্যকর ও বাস্তবসম্মত উপায় গ্রহণ করা যেতে পারে।

আধুনিক প্রযুক্তি ও ড্রোন নজরদারি

লাইফগার্ড ড্রোন: সৈকতের আকাশ থেকে সার্বক্ষণিক নজরদারির জন্য তাপ শনাক্তকারী ক্যামেরাযুক্ত ড্রোন ব্যবহার করা যেতে পারে। কোনো পর্যটক বিপদে পড়লে ড্রোনের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে লাইফ জ্যাকেট বা লাইফ বয়া ছুড়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা সম্ভব।

দূরনিয়ন্ত্রিত উদ্ধারকারী নৌযান: তীব্র ঢেউয়ের মধ্যে মানুষের পক্ষে সাঁতরে বিপদগ্রস্ত ব্যক্তির কাছে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হলে দূরনিয়ন্ত্রিত জীবনরক্ষাকারী নৌযান বা রোবট দ্রুত সংকটাপন্ন পর্যটকের কাছে পাঠানোর ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

ডিজিটাল নজরদারি ও তাৎক্ষণিক সতর্কবার্তা

ডিজিটাল তথ্যফলক ও প্রদর্শনব্যবস্থা: সৈকতের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে বড় ডিজিটাল পর্দা স্থাপন করে জোয়ার-ভাটার সঠিক সময় এবং সমুদ্রের বর্তমান অবস্থা—শান্ত নাকি উত্তাল—তা তাৎক্ষণিকভাবে প্রদর্শন করতে হবে।

মুঠোফোনের অ্যাপ ও অবস্থান শনাক্তকরণ: কক্সবাজারে আসা পর্যটকদের জন্য একটি নির্দিষ্ট মুঠোফোনের অ্যাপ বা স্মার্ট হাতবন্ধনী চালু করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে কোনো পর্যটক গভীর পানিতে চলে গেলে বা স্রোতে ভেসে গেলে স্বয়ংক্রিয় সতর্কবার্তা নিয়ন্ত্রণকক্ষে পৌঁছে যাওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

নিরাপদ এলাকা নির্ধারণ ও লাল-সবুজ পতাকা ব্যবস্থার কঠোর প্রয়োগ

নিরাপদ সাঁতারের এলাকা: সৈকতকে নির্দিষ্ট এলাকায় ভাগ করতে হবে। যেখানে স্রোত তুলনামূলক কম, কেবল সেখানেই গোসলের অনুমতি দেওয়া উচিত। এসব এলাকা ভাসমান বয়া দিয়ে চিহ্নিত করা প্রয়োজন।

পতাকার নির্দেশনা কঠোরভাবে কার্যকর করা: লাল পতাকা উত্তোলন করা হলে পানিতে নামা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে। অনেক পর্যটক এ নির্দেশনা অবহেলা করেন। তাই ট্যুরিস্ট পুলিশ ও লাইফগার্ডদের এ বিষয়ে কঠোর নজরদারি রাখতে হবে।

লাইফগার্ডের জনবল ও সক্ষমতা বৃদ্ধি

দিন-রাত লাইফগার্ড ও পর্যবেক্ষণ টাওয়ার: সৈকতে পর্যবেক্ষণ টাওয়ারের সংখ্যা বাড়াতে হবে। পর্যাপ্ত আধুনিক সুযোগ-সুবিধা, দূরবীক্ষণ যন্ত্র এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জামসহ দক্ষ লাইফগার্ড নিয়োগ করতে হবে।

উন্নত উদ্ধার সরঞ্জাম: লাইফগার্ডদের জন্য দ্রুতগতির জেটস্কি, স্পিডবোট এবং পর্যাপ্ত লাইফ জ্যাকেট নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

সচেতনতা বৃদ্ধি ও বাধ্যতামূলক নিয়মাবলি

মাইকিং ও প্রচার: সৈকত এলাকায় নিয়মিত বিরতিতে বাংলা ও ইংরেজিতে সচেতনতামূলক প্রচার চালাতে হবে। বিশেষ করে ‘রিপ কারেন্ট’ বা গুপ্ত স্রোত সম্পর্কে পর্যটকদের সতর্ক করা দরকার।

লাইফ জ্যাকেট বাধ্যতামূলক করা: যাঁরা সাঁতার জানেন না বা গভীর পানিতে যেতে চান, তাঁদের জন্য লাইফ জ্যাকেট পরা বাধ্যতামূলক করা উচিত। সৈকতের ছাতা বা কিটকটের মালিক এবং স্থানীয় হকারদের মাধ্যমেও সচেতনতামূলক বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে।

স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে নিয়ে উদ্ধারকারী দল গঠন

স্থানীয়দের প্রশিক্ষণ: সৈকতের স্থানীয় হকার, সার্ফার এবং কিটকট চালকদের প্রাথমিক চিকিৎসা ও হৃদ্‌যন্ত্র এবং শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ হয়ে গেলে পুনরুজ্জীবিত করার পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণ দিয়ে একটি স্বেচ্ছাসেবী দল গঠন করা যেতে পারে। কারণ, দুর্ঘটনার সময় লাইফগার্ড পৌঁছানোর আগেই তাঁরা দ্রুত সাড়া দিতে পারবেন এবং প্রাথমিক সহায়তা দিতে পারবেন।

সমুদ্রের প্রাকৃতিক আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তবে সচেতনতা, কঠোর নিয়মকানুন এবং আধুনিক প্রযুক্তির সঠিক সমন্বয়ের মাধ্যমে কক্সবাজার সৈকতে পর্যটকদের অকালমৃত্যুর ঝুঁকি শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার লক্ষ্যে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা সম্ভব।

পর্যটকদের জন্য, বিশেষ করে যাঁরা সমুদ্রে ভেসে থাকতে চান, তাঁদের জন্য কিছু সুনির্দিষ্ট নিয়ম প্রণয়ন করতে হবে। কেউ এসব নিয়ম অমান্য করলে তাৎক্ষণিক জরিমানার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে নিয়মগুলো সম্পর্কে পর্যটকদের আগে থেকেই জানাতে হবে এবং সেগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।

কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত দেশের গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনসম্পদ। তাই পর্যটকদের জীবন রক্ষায় সমন্বিত, আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা, যাতে পর্যটকেরা নিরাপদে সমুদ্রসৈকতের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন।

আরও পড়ুন