দেশের ৯০ শতাংশ সমস্যার মূলে রয়েছে বেকারত্ব—এ কথাটি যেমন নির্মম সত্য, তেমনি আমাদের দেশের সামাজিক বাস্তবতায় এর ভয়াব্যতা অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে বহুগুণ বেশি। বিশ্বের অন্যান্য উন্নত দেশের সঙ্গে আমাদের তুলনা করলে চলবে না; কারণ বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। এখানে একটি পরিবারের উপার্জনক্ষম একক ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা অসংখ্য। এই একক আয়ের ওপর নির্ভরশীলতার চাপ যখন অসহনীয় হয়ে ওঠে, তখন থেকেই শুরু হয় বহুমুখী সামাজিক বিপর্যয়। চুরি, ডাকাতি, খুন, ধর্ষণ, মাদকাসক্ত হওয়া, চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও প্রতারণার মতো বড় বড় অপরাধের মূল শিকড় প্রোথিত রয়েছে এই বেকারত্বের মাটিতেই। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য আর কালক্ষেপণ না করে একটি সুনির্দিষ্ট ও কঠোর জাতীয় কর্মসংস্থান নীতিমালা প্রণয়ন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
অলস বেকারত্ব দূরীকরণ ও আইনি কাঠামোর ভাবনা
পরিবারে একজন উপার্জনকারীর ওপর একাধিক ব্যক্তির নির্ভরশীলতা কমানো এবং দেশের বিশাল মানবসম্পদকে সঠিকভাবে কাজে লাগানোর জন্য একটি রূপরেখা নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। ২০ বছর বয়সের পর কর্মক্ষম নাগরিকদের জন্য কর্মসংস্থান বা স্বনির্ভরতা বাধ্যতামূলক করা এবং অলস বেকারত্ব দূরীকরণে একটি কাঠামোগত আইন প্রণয়ন করা যেতে পারে। দেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরে এই ভাবনাটি একটি টার্নিং পয়েন্ট হতে পারে, তবে এর বাস্তবায়নে সামাজিক, আইনি ও অর্থনৈতিক দিকগুলো অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
আমাদের প্রস্তাবিত আইনি কাঠামোর মূল রূপরেখাটি নিচের বিষয়গুলোর ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠতে পারে:
১. বাধ্যতামূলক কর্মমুখী শিক্ষা: ২০ বছর বয়স পর্যন্ত প্রতিটি নাগরিকের জন্য সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি ন্যূনতম একটি কারিগরি বা বৃত্তিমূলক যোগ্যতা অর্জন বাধ্যতামূলক করা।
২. জাতীয় কর্মসংস্থান ডেটাবেজ: একটি কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডার তৈরি করা, যেখানে ২০ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রত্যেক নাগরিকের কর্মসংস্থান ও আয়ের স্থিতি নিবন্ধিত থাকবে।
৩. যৌক্তিক সময়সীমা (Grace Period): শিক্ষা শেষ করার পর বা ২০ বছর পূর্ণ হওয়ার পর কাজ খুঁজে নেওয়ার জন্য ১ থেকে ২ বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা দেওয়া যেতে পারে।
৪. জবাবদিহিতা ও ব্যতিক্রম: কোনো ব্যক্তি যদি কোনো শারীরিক বা মানসিক সীমাবদ্ধতা ছাড়াই অলস বসে থাকেন, তবে তাকে আইনি জবাবদিহিতার আওতায় আনা। তবে গুরুতর অসুস্থতা, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা বা বিশেষ পারিবারিক পরিস্থিতির ক্ষেত্রে এই আইন শিথিল থাকবে।
বাস্তবায়নের প্রধান চ্যালেঞ্জসমূহ
এই যুগান্তকারী পদক্ষেপ বাস্তবায়নের পথে কিছু বাস্তব বাধা রয়েছে, যা আমাদের জয় করতেই হবে। উন্নত বিশ্বের অন্ধ অনুকরণ এখানে চলবে না, কারণ আমাদের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো হলো:
পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের অভাব: নাগরিকদের কাজে বাধ্য করার আগে রাষ্ট্রের প্রথম ও প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো সবার জন্য উপযুক্ত কাজের সুযোগ তৈরি করা। কাজের ক্ষেত্র তৈরি না করে আইন প্রয়োগ করলে তা হিতে বিপরীত হতে পারে।
আন্তর্জাতিক শ্রম আইন ও মানবাধিকার: আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) নীতিমালা অনুযায়ী জোরপূর্বক শ্রম বা কাজ না পাওয়ার কারণে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ আইনি ও মানবাধিকার সংক্রান্ত জটিলতার সৃষ্টি করতে পারে।
সামাজিক নিরাপত্তা ও স্বনির্ভরতার অভাব: উন্নত দেশগুলোতে বেকারদের জন্য 'বেকার ভাতা' বা সামাজিক সুরক্ষার শক্তিশালী অবকাঠামো থাকে। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে সেই নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে সরাসরি শাস্তি দিলে সামাজিক অসন্তোষ বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে।
বাস্তবসম্মত ও পরিপূরক সমাধান
চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করে এই রূপরেক্ষাকে সফল করতে হলে আমাদের বহুমুখী ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিতে হবে। রাষ্ট্র ও ব্যক্তিগত উদ্যোগের একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমন্বয়ই এখানে চাবিকাঠি:
উদ্যোক্তা তৈরিতে রাষ্ট্রীয় সহায়তা: যুবসমাজ যেন শুধু চাকরির পেছনে না ছুটে নিজে কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে, সে জন্য সহজ শর্তে জামানতবিহীন ঋণ এবং উপযুক্ত ব্যবসার প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
বেকারত্ব দূরীকরণে কর প্রণোদনা: যে সমস্ত বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তরুণদের জন্য বেশি বেশি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে, তাদের জন্য কর ছাড় বা বিশেষ সুবিধার ব্যবস্থা করা।
কাউন্সেলিং ও কর্মসংস্থান সেল: প্রতিটি উপজেলা বা জেলা পর্যায়ে কর্মসংস্থান কেন্দ্র বা সেল স্থাপন করা, যা অলস যুবসমাজকে চিহ্নিত করে তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী কাজে নিয়োজিত করতে উৎসাহিত ও সহায়তা করবে।
রাষ্ট্র বনাম ব্যক্তিগত উদ্যোগ
এই আইনটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মূল প্রশ্ন হলো—আমরা কি সরকারি কর্মসংস্থান নিশ্চিতকরণকে পূর্বশর্ত হিসেবে দেখব, নাকি ব্যক্তিগত উদ্যোগে আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর বেশি জোর দেব? বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই দুটির কোনোটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি সফল করা সম্ভব নয়। তবে সফল বাস্তবায়নের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র ও পরিবেশ তৈরি করাকে প্রধান পূর্বশর্ত হিসেবে দেখতে হবে। রাষ্ট্র আগে পর্যাপ্ত কাজের সুযোগ বা ক্ষেত্র তৈরি করবে (পূর্বশর্ত), আর নাগরিকরা সেই সুযোগ গ্রহণ করে নিজেদের আত্মনির্ভরশীল হিসেবে গড়ে তুলবে।
পরিশেষে, রাষ্ট্র যদি উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে এবং নাগরিকরা অলসতা ঝেড়ে ফেলে স্বাবলম্বী হওয়ার মানসিকতা তৈরি করে, তবেই বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি পাবে বাংলাদেশ। অপরাধমুক্ত, সমৃদ্ধ ও স্বাবলম্বী একটি জাতি গঠনে এই বহুমুখী কর্মসংস্থান নীতিমালা আজ সময়ের সবচেয়ে বড় অপরিহার্যতা।
