PRB Post

১৫ অক্টোবর, ২০২৬, ২:১৭ AM • মতামত

প্রচলিত সাফল্যের সংজ্ঞা বদলে দেওয়া নায়লা শারাফেরা হোন আমাদের প্রেরণা

PRB Post

১৫ অক্টোবর, ২০২৬ এ ২:১৭ AM • 3 মিনিট পড়া
আপডেট: ১৫ অক্টোবর, ২০২৬ এ ২:৪০ AM

মো. জিয়াউর রহমান

প্রচলিত সাফল্যের সংজ্ঞা বদলে দেওয়া নায়লা শারাফেরা হোন আমাদের প্রেরণা

আজকের দিনে সাফল্যের সংজ্ঞাটা যেন ভীষণ একপেশে ও যান্ত্রিক। ভালো গ্রেড, বুয়েট-মেডিকেলে পড়াশোনা, উচ্চ বেতনের করপোরেট চাকরি, কিংবা বিসিএস ক্যাডার—এটাই যেন তরুণ প্রজন্মের সাফল্যের একমাত্র ফরম্যাট। এই স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে কেউ যদি অন্য কোনো পথ বেছে নেন, তবে সমাজ তাঁকে হয় বোকা ভাবে, নয়তো তাঁর সিদ্ধান্তকে খতিয়ে দেখে বিস্ময়ের দৃষ্টিতে। কিন্তু প্রচলিত এই স্রোতের বিপরীতে হেঁটে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পথ বেছে নিয়েছেন বুয়েটপড়ুয়া নায়লা শারাফ।

খাতার পাতায় চোখ বুলালে দেখা যাবে, প্রচলিত অর্থে সাফল্যের প্রায় সব ধাপই পেরিয়েছিলেন নায়লা। ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে শুরু করে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)—দেশের সেরা বিদ্যাপীঠগুলোতে তাঁর শিক্ষার হাতেখড়ি। ইচ্ছে করলেই তিনি বেছে নিতে পারতেন উচ্চ বেতন, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত করপোরেট অফিস আর সমাজের উঁচুতলার চকচকে কোনো জীবন। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে সহকারী প্রকৌশলী এবং পরবর্তীতে জনতা ব্যাংকে এক্সিকিউটিভ অফিসারের চাকরিও তিনি পেয়েছিলেন। এমনকি ৩৪তম বিসিএসে উত্তীর্ণ হয়েও ক্যাডার পদে যোগ দেওয়ার লোভ তাঁকে আকর্ষণ করতে পারেনি। অনিয়ম কিংবা যান্ত্রিক জীবনের সঙ্গে আপস না করে তিনি একে একে ছেড়ে দিয়েছেন সেই লোভনীয় পদগুলো।

এর বদলে গত সাত বছর ধরে তিনি নিজেকে সঁপে দিয়েছেন নেত্রকোণা সদর উপজেলার পঞ্চাননপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিশুদের মাঝে। বুয়েটের সাবেক একজন শিক্ষার্থীর কাছে যেখানে সমাজের প্রত্যাশা থাকে বড় কোনো প্রকৌশলী বা নীতিনির্ধারক হওয়ার, সেখানে তিনি বেছে নিয়েছেন প্রান্তিক পরিবারের শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার বুনিয়াদ গড়ার কাজটিকে।

নায়লার কাছে জীবনের সাফল্যের সংজ্ঞাটি বড্ড সরল, অথচ গভীর। অর্থ বা খ্যাতির ইঁদুরদৌড়ে শামিল না হয়ে তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন স্বাভাবিক, নিশ্চিন্ত ও বিবেকের প্রশান্তিতে ভরা এক জীবনে। দিন শেষে নিজের কাজ নিয়ে তৃপ্ত থাকা এবং শান্তিতে ঘুমাতে পারাকেই তিনি বড় প্রাপ্তি মনে করেন। তাঁর শ্রেণিকক্ষটি কেবল পাঠ্যবই মুখস্থ করানোর জায়গা নয়; বরং সেখানে শিশুরা শেখে সত্যবাদী, সাহসী ও দায়িত্বশীল মানুষ হতে। নিজের বিবেকের কাছে প্রশ্ন করার অভ্যাস গড়ে তুলতে উৎসাহিত করে নায়লা তাদের মনের জানালাগুলো খুলে দিচ্ছেন। বিদ্যালয়ের নির্ধারিত সময় পেরিয়ে নিজের হাতে ছবি আঁকা, শিক্ষামূলক উপকরণ তৈরি কিংবা ডিজিটাল কনটেন্ট বানানোর যে অদম্য স্পৃহা তিনি দেখান, তা কেবল একজন চাকরিজীবীর দায়িত্ববোধ নয়; এটি শিক্ষকতা নামক মহান ব্রতের প্রতি নিখাদ ভালোবাসা।

ভিকারুননিসায় পড়ার সময় নায়লা যে মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ পেয়েছিলেন, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রান্তিক শিশুরাও যেন সেই আলো থেকে বঞ্চিত না হয়—এটাই তাঁর আজীবনের স্বপ্ন। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক লীলা রানী ভৌমিকের ভাষায়, বুয়েট থেকে পড়ে এসে প্রান্তিক শিশুদের নিজের সন্তানের মতো ভালোবেসে পড়ানোর এই মানসিকতা সত্যিই বিরল।

আমাদের সমাজে নায়লা শারাফ, দুই হাত ছাড়াই বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা মো. আলতাফ হোসেন বা নিজ উদ্যোগে হাজার হাজার গাছ লাগানো রেজাউল কিবরিয়া বাবুলের মতো মানুষেরা যখন সমাজে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন, তখন তা আমাদের আশাবাদী করে তোলে। নিজ নিজ কর্ম ও উদ্যোগের মাধ্যমে তাঁদের এই আত্মত্যাগী প্রচেষ্টা কেবল ব্যক্তিবিশেষের সাফল্য নয়, বরং দেশ ও জাতির প্রকৃত চালিকাশক্তি।

সম্প্রতি এই নিঃস্বার্থ কর্মবীরদের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যথার্থই বলেছেন, "দেশ গঠনে আপনাদের মতো মানুষের অনেক প্রয়োজন। আপনাদের মতো সবাই এগিয়ে এলে দেশ গঠন সহজ হবে।" প্রধানমন্ত্রীর এই মূল্যবান বাণীটি কেবল তাঁদের কাজের স্বীকৃতিই নয়, বরং প্রান্তিক জনপদে মেধার আলো ছড়ানোর এই সাধনাকে এক পরম রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক গুরুত্ব দেয়।

নায়লা শারাফ ও তাঁর মতো দূরদর্শীরা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন যে, সমাজের পরিবর্তন কেবল ওপরের তলা থেকে হয় না; এর ভিত্তি মজবুত করতে হয় শেকড় থেকে। দেশের মেধাবী তরুণদের প্রতি নায়লার আহ্বান—প্রতিদানের আশা না রেখে প্রাথমিক শিক্ষায় এগিয়ে আসার এই মানসিকতাই পারে বাংলাদেশের শিক্ষার চিরাচরিত চিত্র পাল্টে দিতে।

আহা, যদি আমাদের তারুণ্যের বড় একটি অংশ অর্থ-বিত্তের মোহে অন্ধ না হয়ে নায়লা শারাফের মতো একটুখানি আলো ছড়ানোর মন্ত্রে দীক্ষিত হতো! প্রান্তিক শিশুদের জন্য একজন দক্ষ ও আন্তরিক শিক্ষক বা পথপ্রদর্শক হয়ে ওঠার মাঝেই যে লুকিয়ে আছে প্রকৃত সামাজিক দায়িত্ব, মানবজীবনের সার্থকতা এবং দেশ গঠনের মূল ভিত্তি—নায়লা শারাফ নিজের জীবন এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সেই উপলব্ধির সুরেই আজ তা সত্য প্রমাণ করে চলেছেন।

 

 

 

 

আরও পড়ুন