PRB Post

১৪ অক্টোবর, ২০২৬, ৩:১১ PM • মতামত

অফিস কিংবা বাসাবাড়িতে আগুন লাগলে তাৎক্ষণিক কি করবেন

PRB Post

১৪ অক্টোবর, ২০২৬ এ ৩:১১ PM • 7 মিনিট পড়া
আপডেট: ১৫ অক্টোবর, ২০২৬ এ ১১:৫২ AM

দ্বীন মোহাম্মাদ দুখু

অফিস কিংবা বাসাবাড়িতে আগুন লাগলে তাৎক্ষণিক কি করবেন

অফিস কিংবা বাসাবাড়িতে অগ্নিকাণ্ড একটি ভয়াবহ দুর্ঘটনা। সামান্য অসতর্কতা, বৈদ্যুতিক ত্রুটি, গ্যাসের লিকেজ কিংবা দাহ্য পদার্থের অসাবধানতাপূর্ণ ব্যবহারের কারণে মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়তে পারে আগুন। এতে প্রাণহানির পাশাপাশি ব্যাপক সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে। তবে আগুন লাগার পর আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া, নিরাপদে ভবন থেকে বেরিয়ে আসা এবং অগ্নিনিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন থাকা গেলে অনেক বড় দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব।

আগুন লাগলে তাৎক্ষণিক যা করবেন

অফিস কিংবা বাসাবাড়িতে আগুন লাগার ঘটনা ঘটলে প্রথমেই আশপাশের মানুষকে সতর্ক করতে হবে। অগ্নিসংকেত ব্যবস্থা থাকলে তা চালু করতে হবে এবং দ্রুত সবাইকে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার জন্য জানাতে হবে। আগুনের উৎস ছোট মনে হলেও সেটিকে অবহেলা করা যাবে না। আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকলে কোনো কিছু সংগ্রহ করতে গিয়ে সময় নষ্ট না করে ভবন থেকে বেরিয়ে যেতে হবে।

বাংলাদেশে অগ্নিকাণ্ডসহ যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ ফোন করে সহায়তা চাওয়া যায়। ফোন করার সময় ভবনের সঠিক ঠিকানা, আগুন কোন তলায় বা কোথায় লেগেছে, আগুনের ধরন এবং কেউ আটকে আছেন কি না, তা স্পষ্টভাবে জানাতে হবে।

আগুন ছোট হলে এবং তা নেভানোর প্রশিক্ষণ, সঠিক অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র ও নিরাপদে বের হওয়ার পথ থাকলেই কেবল আগুন নেভানোর চেষ্টা করা উচিত। আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে বা ঘন ধোঁয়া তৈরি হলে নিজে নেভানোর চেষ্টা না করে অবিলম্বে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে হবে।

অফিস কিংবা বাসাবাড়িতে আগুন লাগলে প্রথম পাঁচটি কাজ

আগুন লাগার পর প্রথম কয়েক মুহূর্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ সময় করণীয় হলো—

১. সতর্কসংকেত দিন: চিৎকার করে বা অগ্নিসংকেত ব্যবস্থা চালু করে সবাইকে আগুনের খবর জানান।

২. জরুরি সহায়তা চান: ৯৯৯-এ ফোন করে অগ্নিকাণ্ডের খবর দিন এবং ফায়ার সার্ভিসের সহায়তা চান।

৩. নিরাপদ পথে বেরিয়ে যান: কাছের নিরাপদ সিঁড়ি বা জরুরি বহির্গমন পথ ব্যবহার করুন। লিফট ব্যবহার করবেন না।

৪. ধোঁয়া এড়িয়ে চলুন: ধোঁয়া থাকলে যতটা সম্ভব নিচু হয়ে নিরাপদ পথে এগিয়ে যান। ধোঁয়ায় ভরা কক্ষে প্রবেশ করবেন না।

৫. নিরাপদ স্থানে অবস্থান করুন: ভবনের বাইরে নির্ধারিত নিরাপদ স্থানে গিয়ে সবাই উপস্থিত আছেন কি না, তা যাচাই করুন। ফায়ার সার্ভিসের অনুমতি ছাড়া ভবনে ফিরে যাবেন না।

বহুতল ভবন থেকে বের হওয়ার সময় সতর্কতা

অফিস কিংবা বহুতল বাসাবাড়িতে আগুন লাগলে ভবন থেকে বের হওয়ার জন্য সিঁড়ি ব্যবহার করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই লিফট ব্যবহার করা যাবে না। আগুনের কারণে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে লিফটের ভেতরে আটকে পড়ার ঝুঁকি থাকে। পাশাপাশি ধোঁয়া ও তাপ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে মানুষের জীবন বিপন্ন করতে পারে।

ভবন থেকে বের হওয়ার সময় ধাক্কাধাক্কি না করে শৃঙ্খলার সঙ্গে এগোতে হবে। নির্ধারিত জরুরি বহির্গমন পথ ব্যবহার করতে হবে। বের হওয়ার পথে আগুন বা ঘন ধোঁয়া থাকলে সেই পথে যাওয়ার চেষ্টা না করে বিকল্প নিরাপদ পথ খুঁজতে হবে। কোনো দরজা খোলার আগে দরজাটি বা হাতলটি অস্বাভাবিক গরম কি না, তা সতর্কভাবে যাচাই করতে হবে। গরম দরজা খুললে আগুন ও ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়তে পারে।

ভবনের বাইরে নিরাপদ স্থানে গিয়ে অবস্থান করতে হবে এবং অনুমতি ছাড়া পুনরায় ভেতরে প্রবেশ করা যাবে না।

ধোঁয়া থেকে বাঁচতে যা করবেন

অগ্নিকাণ্ডের সময় আগুনের পাশাপাশি ধোঁয়াও বড় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ধোঁয়ার কারণে শ্বাসকষ্ট, চোখে জ্বালাপোড়া, দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া এবং অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটতে পারে। তাই কোনো কক্ষে ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়লে যতটা সম্ভব নিচু হয়ে নিরাপদ পথে বেরিয়ে আসতে হবে। কারণ ধোঁয়া ও গরম বাতাস সাধারণত ওপরের দিকে জমা হয়।

মুখ ও নাক কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখলে কিছু বড় কণা ঠেকানো যেতে পারে, তবে এতে বিষাক্ত ধোঁয়া থেকে নির্ভরযোগ্য সুরক্ষা পাওয়া যায় না। তাই ধোঁয়ায় ভরা কক্ষে অবস্থান না করে দ্রুত বেরিয়ে আসাই সবচেয়ে নিরাপদ। বের হওয়ার সময় অন্যদেরও ধোঁয়ামুক্ত নিরাপদ পথে যেতে সহায়তা করতে হবে, তবে নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলা যাবে না।

বৈদ্যুতিক আগুন লাগলে করণীয়

অফিস কিংবা বাসাবাড়িতে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুন লাগতে পারে। এ ধরনের আগুনে কখনোই পানি ঢালা যাবে না। এতে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে এবং আগুন আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।

নিরাপদে করা সম্ভব হলে বিদ্যুতের প্রধান সংযোগ বন্ধ করতে হবে। তবে আগুনের কাছে গিয়ে বা ঝুঁকি নিয়ে সুইচ বন্ধ করার চেষ্টা করা যাবে না। বৈদ্যুতিক আগুন নেভানোর জন্য উপযুক্ত অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র ব্যবহার করতে হবে। আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে নিজে নেভানোর চেষ্টা না করে দ্রুত বেরিয়ে যেতে হবে এবং ফায়ার সার্ভিসকে খবর দিতে হবে।

গ্যাসের আগুন কিংবা গ্যাস লিকেজ হলে

গ্যাসের গন্ধ পাওয়া গেলে আগুন জ্বালানো, দিয়াশলাই ব্যবহার কিংবা বৈদ্যুতিক সুইচ চালু বা বন্ধ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। এসব কাজ থেকে স্ফুলিঙ্গ সৃষ্টি হয়ে বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। নিরাপদে সম্ভব হলে গ্যাসের মূল সরবরাহ বন্ধ করতে হবে। এরপর দ্রুত সবাইকে বাইরে সরিয়ে নিয়ে নিরাপদ স্থান থেকে জরুরি সহায়তা চাইতে হবে।

গ্যাসের আগুন জ্বলতে থাকলে প্রশিক্ষণ ও উপযুক্ত সরঞ্জাম ছাড়া তা নেভানোর চেষ্টা করা উচিত নয়। কারণ গ্যাসের সরবরাহ বন্ধ না করে আগুন নেভালে আশপাশে দাহ্য গ্যাস জমে বিস্ফোরণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। গ্যাস লিকেজের সন্দেহ থাকলে ভবনের ভেতরে ফোন ব্যবহার না করে বাইরে গিয়ে জরুরি সেবায় যোগাযোগ করতে হবে।

আগুনের মধ্যে আটকে পড়লে যা করবেন

আগুন বা ধোঁয়ার কারণে বের হওয়ার পথ বন্ধ হয়ে গেলে আতঙ্কিত না হয়ে আগুন ও ধোঁয়া থেকে যতটা সম্ভব দূরে নিরাপদ কোনো কক্ষে আশ্রয় নিতে হবে। সম্ভব হলে দরজা বন্ধ করে দিতে হবে। দরজার ফাঁক দিয়ে ধোঁয়া ঢুকলে কাপড় দিয়ে ফাঁক বন্ধ করার চেষ্টা করা যেতে পারে। জানালা বা নিরাপদ স্থানে গিয়ে সাহায্যের সংকেত দিতে হবে এবং জরুরি সেবাকে নিজের অবস্থান জানাতে হবে।

জানালা দিয়ে লাফ দিয়ে নামার চেষ্টা করা বিপজ্জনক। একইভাবে অন্য কাউকে উদ্ধার করতে গিয়ে নিজের জীবন ঝুঁকির মধ্যে ফেলা উচিত নয়। আটকে পড়া ব্যক্তির অবস্থান ফায়ার সার্ভিসকে জানালে উদ্ধারকাজ পরিচালনা করা সহজ হবে।

পোশাকে আগুন লাগলে করণীয়

কোনো ব্যক্তির পোশাকে আগুন ধরে গেলে তাকে দৌড়াতে নিষেধ করতে হবে। দৌড়ালে বাতাসের কারণে আগুন আরও ছড়িয়ে পড়তে পারে। এ অবস্থায় মাটিতে শুয়ে গড়াগড়ি দিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করতে হবে। সম্ভব হলে নিরাপদ উপায়ে আগুনের শিখা ঢেকে দিতে হবে।

আগুন নেভানোর পর পোড়া স্থানে পরিষ্কার, ঠান্ডা প্রবাহমান পানি দিয়ে প্রায় ২০ মিনিট শীতল করতে হবে। বরফ, তেল, টুথপেস্ট বা অন্য কোনো ঘরোয়া উপাদান লাগানো যাবে না। গুরুতর দগ্ধ হলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে।

আগুন লাগার পর আহত ব্যক্তিকে যেভাবে সহায়তা করবেন

অগ্নিকাণ্ডে কেউ দগ্ধ হলে বা ধোঁয়ার কারণে অসুস্থ হয়ে পড়লে দ্রুত চিকিৎসা সহায়তা নিতে হবে। নিরাপদ না হলে আহত ব্যক্তিকে উদ্ধারের জন্য আগুন বা ধোঁয়ার মধ্যে প্রবেশ করা যাবে না। দগ্ধ স্থানে কাপড় লেগে থাকলে জোর করে টেনে খুলবেন না। গুরুতর দগ্ধ ব্যক্তিকে শীতল করার পাশাপাশি জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।

ধোঁয়া শ্বাস নেওয়ার পর শ্বাসকষ্ট, কাশি, মাথা ঘোরা, বিভ্রান্তি কিংবা অজ্ঞান হওয়ার লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে। বাইরে বেরিয়ে আসার পরও ধোঁয়ার কারণে শারীরিক জটিলতা দেখা দিতে পারে।

অফিস ও বাসাবাড়িতে আগুন প্রতিরোধে করণীয়

অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধে বৈদ্যুতিক তার, সকেট, মাল্টিপ্লাগ ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে। একই সকেটে অতিরিক্ত বৈদ্যুতিক যন্ত্র ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত তার ও ত্রুটিপূর্ণ বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম দ্রুত মেরামত বা পরিবর্তন করতে হবে।

রান্নাঘরে গ্যাসের চুলা ব্যবহারের পর সংযোগ বন্ধ আছে কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে। দিয়াশলাই, লাইটার, দাহ্য তরল ও অন্যান্য বিপজ্জনক পদার্থ শিশুদের নাগালের বাইরে রাখতে হবে। রান্নার সময় চুলা জ্বালিয়ে রেখে অন্য কাজে ব্যস্ত হওয়া যাবে না। ঘরে ধূমপান করলে জ্বলন্ত সিগারেট বা দেশলাই সম্পূর্ণ নিভেছে কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে।

অফিস ও বহুতল ভবনে কার্যকর অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র, জরুরি বহির্গমন পথ, অগ্নিসংকেত ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জাম রাখতে হবে। জরুরি বহির্গমন পথ কখনো মালামাল দিয়ে বন্ধ করে রাখা যাবে না। পাশাপাশি কর্মী ও বাসিন্দাদের নিয়মিত অগ্নিনিরাপত্তা প্রশিক্ষণ এবং উদ্ধার মহড়ার আয়োজন করা প্রয়োজন।

সচেতনতাই পারে প্রাণহানি কমাতে

অগ্নিকাণ্ডের পর আতঙ্কিত হয়ে ছোটাছুটি করা, লিফট ব্যবহার করা কিংবা প্রয়োজনীয় সতর্কতা ছাড়া আগুন নেভাতে যাওয়ার কারণে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। তাই আগুন লাগার আগেই নিরাপদে বের হওয়ার পথ সম্পর্কে ধারণা রাখা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে কী করতে হবে, তা জানা প্রত্যেকের জন্য জরুরি।

মনে রাখতে হবে, আগুন লাগলে প্রথম অগ্রাধিকার মানুষের জীবন রক্ষা করা। সম্পদ উদ্ধারের চেষ্টা না করে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়া, জরুরি সেবাকে খবর দেওয়া এবং প্রশিক্ষিত উদ্ধারকর্মীদের নির্দেশনা অনুসরণ করাই হতে পারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। সচেতনতা, প্রস্তুতি ও দ্রুত সঠিক পদক্ষেপই পারে অফিস কিংবা বাসাবাড়িতে অগ্নিকাণ্ডের ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি কমাতে।

আরও পড়ুন