ঢাকা থেকে কক্সবাজার, পঞ্চগড়, খুলনা কিংবা রাজশাহী— আমাদের দেশের বিভিন্ন প্রান্তের দূরপাল্লার রুটে প্রতিদিন হাজার হাজার বাস ও অন্যান্য গণপরিবহন চলাচল করে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যাতায়াতকারী এসব দূরপাল্লার যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং চালকদের আকস্মিক স্বাস্থ্যঝুঁকি, তীব্র ক্লান্তি ও প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা এড়াতে এখন সময়ের দাবি হলো ‘দ্বৈত চালক ব্যবস্থা’ (Dual Driver Policy) অবিলম্বে চালু করা। অন্যথায়, সড়ক দুর্ঘটনাজনিত কারণে অকালেই ঝরে যাবে বহু তাজা প্রাণ।
দ্বৈত চালক ব্যবস্থার অপরিহার্যতা ও সুফল
চলন্ত অবস্থায় দূরপাল্লার বাসের প্রধান চালক হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়া বা হৃদরোগের (স্ট্রোক) শিকার হওয়ার মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা প্রায়ই শোনা যায়। এমন সংকটময় মুহূর্তে গাড়িতে থাকা সহ-চালক বা কো-ড্রাইভার তাৎক্ষণিকভাবে স্টিয়ারিংয়ের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিয়ে বড় ধরনের বিপর্যয় ও মর্মান্তিক দুর্ঘটনা রুখে দিতে পারেন।
পাশাপাশি, দূরপাল্লার রুটে একটানা ৫-৬ ঘণ্টার বেশি বাস চালালে চালকদের শারীরিক ক্লান্তি ও চোখে ঘুম চলে আসা অত্যন্ত স্বাভাবিক। গাড়িতে দুইজন অভিজ্ঞ চালক থাকলে নির্দিষ্ট সময় পর পর তারা শিফট বা দায়িত্ব পরিবর্তন করে সতেজ ও ফ্রেশ অবস্থায় গাড়ি চালাতে সক্ষম হবেন। সবচেয়ে বড় কথা, বাসে যে বিকল্প অভিজ্ঞ চালক উপস্থিত আছেন— এই বিষয়টি জানলে যাত্রীরাও দীর্ঘ ও দূরপাল্লার এই ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় মানসিকভাবে অনেক বেশি নিরাপদ ও স্বস্তিবোধ করবেন।
বাস্তবায়নের পথে প্রধান প্রতিবন্ধকতা
যদিও এই নীতি অত্যন্ত কার্যকর, তবুও বাংলাদেশে এটি পুরোপুরি বাস্তবায়ন ও টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে কিছু বড় বাস্তব বাধা রয়েছে:
আর্থিক চাপ: প্রতিটি বাসে দুইজন করে দক্ষ ও পেশাদার চালক নিয়মিত নিয়োগ দিলে পরিবহন কোম্পানিগুলোর মাসিক বেতন ও আনুষঙ্গিক খরচ বেড়ে যাবে। কোম্পানিগুলোর আশঙ্কা, এই অতিরিক্ত ব্যয়ের নেতিবাচক প্রভাব শেষ পর্যন্ত বাসের টিকিটের বর্ধিত মূল্যের ওপর পড়তে পারে, যার চাপ সাধারণ যাত্রীদের বহন করতে হবে।
টেকসই বাস্তবায়নে করণীয় ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা
এই দ্বৈত চালক ব্যবস্থার টেকসই ও সফল বাস্তবায়নের জন্য পরিবহন খাতের সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষ— বিশেষ করে সরকার, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং মালিক সমিতির সমন্বিত উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি:
সরকারি আইনি বাধ্যবাধকতা: বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষকে (BRTA) একটি নির্দিষ্ট দূরত্বের (যেমন: ৩০০ কিলোমিটারের বেশি) রুটের বাসগুলোর জন্য বাধ্যতামূলকভাবে "ডাবল ড্রাইভার" নীতি বা গাইডলাইন ঘোষণা করতে হবে এবং তা কঠোরভাবে আইনের আওতায় এনে কার্যকর করতে হবে।
হাইওয়ে পুলিশের কঠোর নজরদারি: হাইওয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ চেকপোস্টে বাসের অন্যান্য কাগজপত্রের পাশাপাশি নিয়মিত ‘লগবুক’ বা শিফট খাতা পরীক্ষা করতে হবে। চালক নির্দিষ্ট সময় পরপর পরিবর্তন হচ্ছেন কি না, তা নিশ্চিত করতে পুলিশের কঠোর তদারকি থাকতে হবে।
মালিক সমিতির সদিচ্ছা ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি: পরিবহন মালিকদের কেবল অন্ধ বাণিজ্যিক মুনাফার কথা চিন্তা না করে যাত্রীদের জীবন রক্ষা এবং চালকদের মানবিক কর্মঘণ্টার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে। নিজেদের স্বতঃস্ফূর্ত উদ্যোগে প্রতিটি দূরপাল্লার গাড়িতে দ্বৈত চালক নিয়োগের নীতি চালু করা উচিত।
সড়ক দুর্ঘটনা রোধ এবং দেশের সাধারণ মানুষের মূল্যবান জীবন রক্ষা করতে হলে দূরপাল্লার গণপরিবহনে এই দ্বৈত চালক নীতির বিকল্প নেই। অন্যথায়, প্রতিবছর দেশের এই সমস্ত দূরপাল্লার রুটে মর্মান্তিক দুর্ঘটনার কবলে পড়ে অসংখ্য মানুষের অকাল মৃত্যুর ঝুঁকি ও আশঙ্কা থেকেই যাবে। সময় থাকতেই সংশ্লিষ্ট মহল এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে—এটাই দেশবাসীর প্রত্যাশা।
