PRB Post

২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:২১ PM • মতামত

খুন, ধর্ষণ ও পৈশাচিকতার উৎস যখন মাদক

PRB Post

২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ১১:২১ PM • 4 মিনিট পড়া
আপডেট: ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ১২:১৫ AM

অ্যাডভোকেট মোস্তফা মাহমুদ আরিফি

খুন, ধর্ষণ ও পৈশাচিকতার উৎস যখন মাদক

সাম্প্রতিক সময়ে শিশু অপ্রতিমের মর্মান্তিক ও নির্মম হত্যাকাণ্ড আমাদের জাতীয় বিবেককে এমন এক স্থানে নাড়া দিয়েছে, যা সহজে ক্ষমার যোগ্য নয়। একটি নিষ্পাপ শিশুকে যেভাবে প্রাণ হারাতে হয়েছে, তা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; এটি আমাদের সামাজিক ও নৈতিক কাঠামোর চরম অবক্ষয়ের এক ভয়ংকর চিত্র। অপরাধবিজ্ঞান ও সাধারণ যুক্তির নিরিখে বিচার করলে পরিষ্কার বোঝা যায়, কোনো সুস্থ, স্বাভাবিক ও সংবেদনশীল মানুষের পক্ষে এমন পৈশাচিক ও জঘন্যতম কাজ করা সম্ভব নয়। এই ঘটনার পেছনে কাজ করেছে মাদকাসক্তির মতো এক সর্বনাশা ও পিশাচবৃত্তি।

আজ মাদক কেবল শহুরে বিত্তশালীদের প্রমোদতরীর বিনোদন বা বিপথগামী যুবকদের আড্ডার বস্তু নয়; এটি সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এবং শেকড় পর্যন্ত প্রবেশ করেছে। শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামের মাঠঘাট, খেটে খাওয়া দিনমজুর, কৃষক থেকে শুরু করে তরুণ সমাজ পর্যন্ত মদ, গাঁজা, ইয়াবাসহ নানা মাদকের নেশায় বুঁদ হয়ে আছে। অত্যন্ত শিউরে ওঠার মতো বাস্তবতা হলো, সমাজের উঠতি বয়সী তরুণ ও কিশোর শ্রেণীও এই ভয়াল নেশায় আক্রান্ত। যে দেশ বা সমাজের ভবিষ্যৎ কর্ণধার হিসেবে পরিচিত তরুণ প্রজন্ম নেশার আবর্তে বন্দি থাকে, সে দেশের ভবিষ্যৎ কতটা অন্ধকার, তা সহজেই অনুমেয়। মাদকাসক্তি কেবল একজন ব্যক্তির জীবন বা একটি পরিবারকে ধ্বংস করে না, এটি পুরো রাষ্ট্র ও সমাজকে ভেতর থেকে তিল তিল করে ধ্বংস করে দেয়।

দেশকে সম্পূর্ণরূপে সন্ত্রাস, অপরাধ এবং এই পৈশাচিকতা থেকে মুক্ত করতে হলে মাদকাসক্তি ও মাদক ব্যবসা নির্মূলে একটি বহুমুখী, সুপরিকল্পিত এবং আপসহীন পদক্ষেপ গ্রহণ করা সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। এই সংকট মোকাবিলায় আমাদের করণীয় দিকগুলো গভীরভাবে বিবেচনা করা উচিত:

১. কঠোর আইন প্রয়োগ ও জিরো টলারেন্স নীতি
মাদক সিন্ডিকেট ধ্বংস: মাদক ব্যবসার মূল হোতা, গডফাদার, সরবরাহকারী এবং চোরাচালানিদের সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক মাদক কেনাবেচার সমস্ত রুট কঠোর নজরদারিতে রাখতে হবে।

প্রশাসনিক ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা: আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা প্রশাসনের ভেতরে কেউ যদি মাদক ব্যবসায়ীদের সাথে হাত মেলায় বা অপরাধীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়, তবে তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ও কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।

দ্রুত বিচার ও ট্রাইব্যুনাল: মাদক সংক্রান্ত অপরাধ এবং এর প্রভাবে ঘটা নৃশংস হত্যাকাণ্ড বা অপরাধগুলোর বিচার দীর্ঘসূত্রিতা এড়াতে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে সম্পন্ন করে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

২. সচেতনতা বৃদ্ধি ও সামাজিক প্রতিরোধ
পারিবারিক সচেতনতা: সন্তানরা কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে এবং তাদের আচরণে কোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তন (যেমন হঠাৎ মেজাজ হারানো, টাকা চুরির প্রবণতা, রাত জাগা) দেখা দিচ্ছে কি না, সে বিষয়ে অভিভাবকদের অত্যন্ত সজাগ থাকতে হবে।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রচারণা: স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে এবং নিয়মিত সেমিনারের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে মাদকের কুফল সম্পর্কে সচেতন করতে হবে।

সামাজিক কমিটি গঠন: প্রতিটি পাড়া, মহল্লা ও গ্রামে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, তরুণ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়ে শক্তিশালী "মাদক প্রতিরোধ কমিটি" গঠন করতে হবে, যারা মাদক কেনাবেচার ওপর কড়া নজরদারি রাখবে।

৩. চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও ডোপ টেস্টের মতো কঠোর পদক্ষেপ
বাধ্যতামূলক ডোপ টেস্ট: করোনা মহামারী বা বিশেষ সংকটের সময়ের মতো দেশজুড়ে ব্যাপক পরিসরে ডোপ টেস্ট কর্মসূচি চালু করতে হবে। সাধারণ জনগণ, যুবক, ছাত্র, রাজনৈতিক নেতাকর্মী, প্রশাসন, পুলিশ, সেনাবাহিনী, আইনজীবী, বিচারক, জনপ্রতিনিধি এবং ব্যবসায়ীসহ সমাজের সর্বস্তরের মানুষের মাঝে পর্যায়ক্রমে ডোপ টেস্টের মাধ্যমে মাদকসেবীদের চিহ্নিত করতে হবে।

আইসোলেশন ও রিহ্যাবে প্রেরণ: চিহ্নিত মাদকাসক্তদের শুধু অপরাধী হিসেবে গণ্য না করে, তাদের সমাজ থেকে আইসোলেট বা নিরাপদ দূরত্বে রেখে সরকারি উদ্যোগে প্রতিটি জেলায় উন্নত ও সাশ্রয়ী পুনর্বাসন কেন্দ্রে (Rehab Center) পাঠিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।

মানসিক স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থান: আসক্ত ব্যক্তিদের মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার জন্য দক্ষ কাউন্সেলরদের সংখ্যা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি, পুনর্বাসন শেষে সুস্থ হয়ে ওঠা ব্যক্তিদের সমাজের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনতে কারিগরি শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে, যাতে তারা পুনরায় অপরাধের দিকে ঝুঁকে না পড়ে।

৪. কিশোর গ্যাং ও স্থানীয় অপরাধ নিয়ন্ত্রণ
কিশোরদের ওপর নজরদারি: বর্তমান সময়ের সমাজবিনাশী "কিশোর গ্যাং" কালচারের সাথে মাদকের গভীর যোগসূত্র রয়েছে। উঠতি বয়সীদের এই অপরাধ চক্র রুখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিয়মিত অভিযান চালাতে হবে।

সুস্থ বিনোদনের ব্যবস্থা: তরুণ সমাজকে মাদক থেকে দূরে রাখতে প্রতিটি এলাকায় খেলার মাঠ, পাঠাগার, উন্মুক্ত উদ্যান এবং সুস্থ সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি।

৫. প্রযুক্তি ও আধুনিক নজরদারি
নৈশকালীন টহল ও সিসিটিভি: মাদক কেনাবেচার প্রধান সময় হলো রাত। তাই অপরাধপ্রবণ এলাকা, অন্ধকার গলি এবং মহাসড়কগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং গভীর রাতে পুলিশের টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করতে হবে।

গোপন তথ্য আদান-প্রদান: সাধারণ মানুষ যাতে নিজের পরিচয় গোপন রেখে মাদক ব্যবসায়ী বা গডফাদারদের সুনির্দিষ্ট তথ্য পুলিশ বা প্রশাসনকে দিতে পারে, সেজন্য একটি নিরাপদ ও কার্যকর হটলাইন বা মোবাইল অ্যাপের ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

মাদক ও সন্ত্রাসমুক্ত সমাজ গঠন কোনো একক ব্যক্তি, পুলিশ বা সরকারের পক্ষে রাতারাতি বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং সাধারণ জনগণের সম্মিলিত প্রতিরোধ। আজ সাধারণ জনগণ, যুবক, ছাত্র, রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, প্রশাসন, পুলিশ, সেনাবাহিনী, আইনজীবী, বিচারক, জনপ্রতিনিধি ও ব্যবসায়ী—নির্বিশেষে সমাজের প্রতিটি নাগরিককে এই মরণনেশার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। দলীয় পরিচয় বা সামাজিক অবস্থান যাই হোক না কেন, কাউকেই ছাড় না দিয়ে এই করালগ্রাস থেকে দেশ ও জাতিকে রক্ষা করতে হবে। অপ্রতিমের মতো কোনো শিশুকে যেন আর এমন নিষ্ঠুরতার শিকার হতে না হয়—আজকের দিনে এটাই হোক আমাদের সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার।

 

আরও পড়ুন