PRB Post

২ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:৫৭ AM • মতামত

জুমার খুতবা: শুধু শোনা নয়, মন দিয়ে উপলব্ধি করে জীবনে বাস্তবায়নই হোক লক্ষ্য

PRB Post

২ অক্টোবর, ২০২৬ এ ১১:৫৭ AM • 4 মিনিট পড়া

অ্যাডভোকেট মোস্তফা মাহমুদ আরিফি

জুমার খুতবা: শুধু শোনা নয়, মন দিয়ে উপলব্ধি করে জীবনে বাস্তবায়নই হোক লক্ষ্য

 

আজ শুক্রবার। জুমার দিন। ইনশাআল্লাহ, আমরা অনেকেই জুমার নামাজ আদায় করতে মসজিদে যাব। কিন্তু বাস্তবতা হলো, নানা ব্যস্ততা কিংবা অবহেলার কারণে অনেকেই খুতবার সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর মসজিদে পৌঁছান এবং তাড়াহুড়ো করে ইমামের সঙ্গে শুধু দুই রাকাত ফরজ নামাজ আদায় করেই দায়িত্ব শেষ হয়েছে বলে মনে করেন। অথচ জুমার দিনের মর্যাদা ও ফজিলত এবং জুমার নামাজের বিধান সম্পর্কে সচেতন হওয়া প্রত্যেক মুসলমানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

জুমার দিনের বিশেষ মর্যাদা ইসলামে সুপ্রতিষ্ঠিত। এই দিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো জুমার নামাজ এবং তার পূর্বে অনুষ্ঠিত খুতবা মনোযোগ দিয়ে শ্রবণ করা। খুতবা শুধু আনুষ্ঠানিক বক্তব্য নয়; বরং এটি মুসলমানদের সাপ্তাহিক নসিহত, আত্মশুদ্ধি ও দ্বীনি শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

ইসলামি ফিকহের আলোচনায় জুমার খুতবার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। জুমার নামাজ দুই রাকাত ফরজ এবং এর আগে খুতবা দেওয়া জুমার বিধানের অপরিহার্য অংশ। তাই খুতবার সময় মসজিদে উপস্থিত থাকা এবং তা মনোযোগ দিয়ে শোনা জুমার আদব ও গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত।

খুতবার সময় নীরব থাকা

খুতবা চলাকালে কথা বলা থেকে বিরত থাকার ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ (সা.) কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন। সহিহ বুখারিতে বর্ণিত হয়েছে, ইমাম যখন খুতবা দেন, তখন কেউ তার পাশের ব্যক্তিকে ‘চুপ করো’ বললেও সে অনর্থক কাজে লিপ্ত হলো।

হাদিসটির শিক্ষা অত্যন্ত স্পষ্ট—খুতবা চলাকালে অন্যের সঙ্গে কথাবার্তা বলা তো বটেই, এমনকি কাউকে কথা বলতে নিষেধ করতেও মুখে কথা বলা থেকে বিরত থাকতে হবে। কারণ সে সময় ইমামের বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শোনাই মুসল্লির দায়িত্ব।

অমনোযোগিতাও অনুচিত

খুতবার সময় শুধু কথাবার্তা নয়, এমন কাজও পরিহার করা উচিত যা মানুষের মনোযোগ নষ্ট করে। সহিহ মুসলিমে এসেছে, যে ব্যক্তি খুতবার সময় কঙ্কর স্পর্শ করল, সে অনর্থক কাজে লিপ্ত হলো।

এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, খুতবা চলাকালে অপ্রয়োজনীয় নড়াচড়া, খেলাচ্ছলে কিছু নাড়াচাড়া করা কিংবা অন্য কোনো কাজে ব্যস্ত থাকা উচিত নয়। বর্তমান সময়ে এর মধ্যে মোবাইল ফোন দেখা, বার্তা পড়া, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করা কিংবা অপ্রয়োজনীয়ভাবে ফোন নিয়ে ব্যস্ত থাকাও পড়ে।

জুমার ফজিলত লাভে খুতবার গুরুত্ব

জুমার নামাজের ফজিলত সম্পর্কে একাধিক হাদিসে সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। সহিহ মুসলিমের একটি হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি উত্তমরূপে ওজু করে জুমার নামাজে আসে, মনোযোগ দিয়ে খুতবা শোনে এবং নীরব থাকে, তার এক জুমা থেকে পরবর্তী জুমা পর্যন্ত এবং অতিরিক্ত তিন দিনের গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়।

অতএব, জুমার নামাজকে কেবল দুই রাকাত ফরজ নামাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখা ঠিক নয়। জুমার প্রস্তুতি, মসজিদে যথাসময়ে উপস্থিত হওয়া, খুতবা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং নামাজ আদায়—সব মিলিয়েই একজন মুসলমানের জুমার দিনের আমল পূর্ণতা পায়।

খুতবা—সাপ্তাহিক আত্মশুদ্ধির সুযোগ

জুমার খুতবার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর শিক্ষামূলক ভূমিকা। একজন ইমাম খুতবার মাধ্যমে কোরআন-হাদিসের শিক্ষা, তাকওয়া, নৈতিকতা, পারিবারিক দায়িত্ব, সামাজিক মূল্যবোধ এবং মানুষের আত্মশুদ্ধির বিষয়ে মুসল্লিদের নসিহত করেন।

সপ্তাহের ব্যস্ত জীবনে একজন মুসলমানের জন্য এটি নিজেকে যাচাই করারও একটি সুযোগ। আমি কোথায় ভুল করছি, কোন আমল থেকে দূরে আছি, কীভাবে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতে পারি—খুতবার নসিহত এসব বিষয়ে মানুষকে নতুন করে ভাবতে শেখায়।

তাই খুতবা শুধু কানে শোনার বিষয় নয়; বরং হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করে জীবনে তার শিক্ষা বাস্তবায়ন করাই এর মূল উদ্দেশ্য।

খুতবার সময় আমাদের করণীয়

খুতবা শুরু হওয়ার আগেই মসজিদে পৌঁছানোর চেষ্টা করা উচিত। ইমাম খুতবা শুরু করলে নীরবে বসে মনোযোগ দিয়ে তাঁর বক্তব্য শোনা, অপ্রয়োজনীয় নড়াচড়া থেকে বিরত থাকা এবং মোবাইল ফোন নীরব করে রাখা উচিত।

এ সময় পারস্পরিক কথাবার্তা, অপ্রয়োজনীয় ইশারা-ইঙ্গিত, মোবাইল ব্যবহার, তাসবিহ বা অন্যান্য এমন কাজে ব্যস্ত থাকা উচিত নয় যা খুতবার প্রতি মনোযোগ নষ্ট করে। ঘুম বা তন্দ্রা এড়িয়ে সতর্ক ও মনোযোগী থাকাও জরুরি।

আমাদের প্রত্যেকের অঙ্গীকার হোক

জুমার দিন মসজিদে গিয়ে শুধু দুই রাকাত ফরজ নামাজ আদায় করেই যেন আমরা দায়িত্ব শেষ হয়েছে মনে না করি। বরং খুতবা শুরু হওয়ার আগেই মসজিদে উপস্থিত হওয়ার চেষ্টা করি। ইমামের নসিহত মনোযোগ দিয়ে শুনি, নিজের জীবনের সঙ্গে তার শিক্ষা মিলিয়ে দেখি এবং প্রয়োজনীয় সংশোধনের উদ্যোগ নিই।

জুমার খুতবা আমাদের জন্য আল্লাহর দিকে ফিরে আসার, নিজেদের ভুল-ত্রুটি সংশোধনের এবং ঈমান ও আমলকে নতুন করে জাগ্রত করার একটি সাপ্তাহিক সুযোগ। এই সুযোগকে অবহেলা না করে আমরা যদি আন্তরিকতা ও বিনয়ের সঙ্গে খুতবা শ্রবণ করি, তবে জুমার দিনের ইবাদত আরও অর্থবহ হয়ে উঠবে।

আসুন, আজ জুমার খুতবা শুরু হওয়ার আগেই আমরা মসজিদে উপস্থিত হওয়ার চেষ্টা করি এবং ইমামের খুতবা সম্পূর্ণ মনোযোগ, নীরবতা ও বিনয়ের সঙ্গে শ্রবণ করি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে জুমার দিনের মর্যাদা ও ফজিলত যথাযথভাবে অর্জন করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

আরও পড়ুন