পলায়নের অভিযোগে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) প্রধান ও সাবেক ডিআইজি মোহাম্মদ হারুন অর রশীদসহ সাত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে স্থায়ীভাবে বরখাস্ত করেছে সরকার। তাদের মধ্যে পাঁচজন ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর চাকরি ছেড়ে পালিয়েছেন।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শৃঙ্খলা-১ শাখার সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী স্বাক্ষরিত পৃথক সাত প্রজ্ঞাপনে তাদের চাকরি থেকে স্থায়ীভাবে বরখাস্ত করা হয়।
বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তার হলেন- সাবেক ডিবি প্রধান ও অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ, ঢাকা ট্যুরিস্ট পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি শ্যামল কুমার মুখার্জী, লক্ষ্মীপুর জেলার সাবেক পুলিশ সুপার (এসপি) মো. তারেক বিন রশিদ, রাজশাহী রেঞ্জের সাবেক ডিআইজি মো. আনিসুর রহমান, ডিএমপির সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) ফারহানা তাসকিন, ডিএমপির সাবেক এসি মো. মনিরুজ্জামান সরকার এবং টাঙ্গাইল নৌ পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এস এম জাহাঙ্গীর হাছান।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, পলায়নের অভিযোগে তাদের গুরুদণ্ড হিসেবে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে।
সাবেক ডিবি প্রধান হারুন অর রশীদকে বরখাস্ত করার প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, তিনি ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার হিসেবে কর্মরত অবস্থায় ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট থেকে বিনা অনুমতিতে কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন। তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা এবং কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠানো হলেও তিনি তারা জবাব দেননি।
তাই তার বিরুদ্ধে পলায়নের অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় তাকে পলায়নের তারিখ থেকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে।
শ্যামল কুমার মুখার্জীকে বরখাস্ত করার প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, অতিরিক্ত ডিআইজি হিসেবে ট্যুরিস্ট পুলিশে কর্মকালীন অবস্থায় তাকে ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি রাজশাহী রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়। ওই বছরের ২২ জানুয়ারি তিনি রেঞ্জ ডিআইজির কার্যালয়ে যোগদান করেন এবং তিন সপ্তাহ বিশ্রামের জন্য প্রস্থান প্রতিবেদন দেন। এরপর ওই বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি তিনি কর্মস্থলে হাজির হওয়ার কথা থাকলেও তিনি আর আসেননি।
পরবর্তীতে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা ও কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হলেও তিনি সেগুলোর জবাব দেননি। তাই পলায়নের অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় তাকে পলায়নের তারিখ থেকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে।
মো. তারেক বিন রশিদকে বরখাস্ত করার প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, তিনি রাজশাহীর সারদায় বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমিতে সংযুক্ত থাকাকালীন ২০২৪ সালের ২ নভেম্বর ১৫ দিনের শ্রান্তি বিনোদন ছুটি ভোগের উদ্দেশে কর্মস্থল ত্যাগ করেন। ছুটিতে থাকা অবস্থায় তিনি চিকিৎসকের পরামর্শে আরও ২১ দিনের বিশ্রাম নেন। কিন্তু বিশ্রাম শেষে তিনি যোগদান না করে কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন।
তাই অসদাচরণ ও পলায়নের অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় তাকে পলায়নের তারিখ থেকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে।
মো. আনিসুর রহমানকে বরখাস্ত করার প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি হিসেবে কর্মকালীন অবস্থায় ২০২৪ সালের ২৭ আগস্ট তাকে নৌ পুলিশে সংযুক্ত করা হয়। ২০২৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি তিনি শারীরিক অসুস্থতার কথা বলে অফিসে একটি ত্রুটিপূর্ণ প্রতিবেদন দাখিল করেন। এরপর থেকে তিনি আর কর্মস্থলে আসেননি।
তাই অসদাচরণ ও পলায়নের অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় তাকে পলায়নের তারিখ থেকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে।
এস এম জাহাঙ্গীর হাছানকে বরখাস্ত করার প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, টাঙ্গাইল নৌ পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে কর্মকালীন অবস্থায় ২০২৪ সালের ৮ অক্টোবর তিনি ১৫ দিনের বহিঃবাংলাদেশ ছুটি নিয়ে কর্মস্থল ত্যাগ করেন। এরপর তিনি ছুটি বাড়ানোর আবেদন করলেও সেটি মঞ্জুর হয়নি। তবে তিনি আর কর্মস্থলে যোগদান করেননি।
তাই পলায়নের অভিযোগে তাকে চাকরি থেকে স্থায়ীভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে।
ফারহানা তাসকিনকে বরখাস্ত করার প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, তিনি ডিএমপিতে এসি হিসেবে কর্মকালীন অবস্থায় স্বামীর সঙ্গে দেখা করতে ৪২ দিনের ছুটি নিয়ে কানাডায় যান। কিন্তু ছুটি শেষ হলেও তিনি আর কর্মস্থলে ফেরেননি। বর্তমানে তিনি সেখানে অবস্থান করছেন।
তাই পলায়নের অভিযোগে তাকে চাকরি থেকে স্থায়ীভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে।
মো. মনিরুজ্জামান সরকারকে বরখাস্ত করার প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, তিনি ডিএমপিতে এসি হিসেবে কর্মকালীন অবস্থায় উচ্চতর ডিগ্রি নিতে যুক্তরাজ্যে যান। তাকে ২০১২ সালের ১০ ডিসেম্বর থেকে ২০১৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ছুটি দেওয়া হয়। পরে তিনি আরও দুই দফায় ২০১৯ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ছুটি নেন।
এরপর তিনি আরও ছুটি চাইলে তা না মঞ্জুর হয় এবং তাকে দেশে ফিরে আসার নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু তিনি কর্মস্থলে যোগদান না করে যুক্তরাজ্যে অবস্থান করেন। তাই তাকে অসদাচরণ ও পলায়নের অভিযোগে চাকরি থেকে স্থায়ীভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে।
বাধ্যতামূলক অবসরে আরেক এসি
এদিকে একই দিন রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শৃঙ্খলা-১ শাখার সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী স্বাক্ষরিত পৃথক আরেক প্রজ্ঞাপনে দিনাজপুর সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার কাজী মিজানুর রহমানকে চাকরি থেকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়।
তার বিরুদ্ধে এক পুলিশ কনস্টেবলের স্ত্রীর সঙ্গে পরকীয়া ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়ানোর অভিযোগ রয়েছে।
