দীর্ঘ ১০০ বছরের ঐতিহ্য, গৌরব ও ইসলামী শিক্ষার ধারাবাহিকতাকে স্মরণীয় করে রাখতে আগামীকাল ২৪ অক্টোবর ফরিদপুরের বাকিগঞ্জ ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে প্রথম অ্যালামনাই অনুষ্ঠান-২০২৬। সকাল ৮টায় মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা হাফেজ মুহাম্মদ ইব্রাহিম (রহ.)-এর কবর জিয়ারতের মধ্য দিয়ে দিনব্যাপী এ অনুষ্ঠানের সূচনা হবে। এতে প্রাক্তন শিক্ষার্থী, শিক্ষক, আমন্ত্রিত অতিথি, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও কয়েক হাজার মানুষের অংশগ্রহণের প্রত্যাশা করছেন আয়োজকেরা।
প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন ফরিদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য নায়েবা ইউসুফ। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, জেলা পরিষদের প্রশাসক আফজাল হোসেন খান পলাশ, বিশিষ্ট সমাজসেবক অধ্যাপক আবদুত তাওয়াব এবং মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতার নাতি ও ছুটি গ্রুপের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মোস্তফা মাহমুদ আরিফি। এ ছাড়া মাদ্রাসার প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার কয়েক হাজার মানুষের সমাগম ঘটবে বলে আশা করা হচ্ছে।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে দেশের খ্যাতনামা ইসলামী সংগীতশিল্পীদের অংশগ্রহণে ইসলামী গানের আয়োজন থাকবে।
প্রতিষ্ঠার ইতিহাস ও ঐতিহ্য
১৯২২ সালে বাকিগঞ্জ ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। তৎকালীন বৃহত্তর ফরিদপুরসহ পার্শ্ববর্তী মাগুরা, মানিকগঞ্জ এবং ঢাকা জেলার দোহার ও নবাবগঞ্জ এলাকায় ইসলামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভাব ছিল। ধর্মীয় জ্ঞান ও সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি ইসলামী শিক্ষার প্রসারের লক্ষ্যে এ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
প্রতিষ্ঠাতা হাফেজ মুহাম্মদ ইব্রাহিম (রহ.) তাঁর পীর জৌনপুরের পীর সাহেবদের সঙ্গে নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় মাহফিলের মাধ্যমে ইসলামের দাওয়াত প্রচার করতেন। সে সময়ের সামাজিক ও ধর্মীয় বাস্তবতায় একটি ইসলামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করেন।
এরই ধারাবাহিকতায় দক্ষিণ চর মাধবদিয়া মৌজায় তাঁর মালিকানাধীন প্রায় ১০০ বিঘা জমির ওপর মাদ্রাসাটি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়। স্থানীয় মানুষের সহযোগিতা ও সমর্থনে ১৯২২ সালে প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হয়।
নামকরণের পেছনের ইতিহাস
মাদ্রাসার নামকরণের সময় অনেকে প্রতিষ্ঠাতার নামে প্রতিষ্ঠানটির নাম রাখার প্রস্তাব দিলেও তিনি তাতে সম্মতি দেননি। বরং ব্রিটিশ ভারতের বিশিষ্ট ধর্মীয় সংস্কারক বাকীবিল্লাহ (রহ.)-এর নাম অনুসারে প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করেন। পরবর্তী সময়ে এলাকাটিও বাকিগঞ্জ নামে পরিচিতি লাভ করে।
প্রাথমিকভাবে হাফেজি মাদ্রাসা হিসেবে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি ধাপে ধাপে দাখিল, আলিম ও ফাজিল স্তরে উন্নীত হয়। পরে কামিল স্তর চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে তৎকালীন সহসভাপতি অ্যাডভোকেট মোস্তফা মাহমুদ আরিফির পরামর্শক্রমে অধ্যক্ষ মাহমুদুল হাসান ও উপাধ্যক্ষ রেশাদুল হাকীম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
অসংখ্য কৃতী শিক্ষার্থী তৈরির প্রতিষ্ঠান
দীর্ঘ এক শতাব্দীর পথচলায় এ মাদ্রাসা থেকে হাজার হাজার শিক্ষার্থী শিক্ষা গ্রহণ করে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে পদকপ্রাপ্ত বিশিষ্ট সমাজসেবক অধ্যাপক আবদুস সামাদ এবং ফরিদপুর জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান লোকমান হোসেন মৃধাসহ অনেকে রয়েছেন।
প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন সময়ে ফরিদপুর জেলা ও সদর উপজেলার শ্রেষ্ঠ মাদ্রাসা হিসেবে পুরস্কার লাভ করেছে। জাতীয় পর্যায়ের বহু নেতা ও বিশিষ্ট ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের আগমনও প্রতিষ্ঠানটির ঐতিহ্য ও মর্যাদাকে সমৃদ্ধ করেছে।
অ্যালামনাই অনুষ্ঠান ঘিরে প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মিলনমেলা
শতবর্ষের ঐতিহ্যকে সামনে রেখে আয়োজিত এ অনুষ্ঠান প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের জন্য পুনর্মিলন ও স্মৃতিচারণের বিশেষ উপলক্ষ হয়ে উঠবে। অনুষ্ঠানে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত, হামদ-নাত, অতিথিদের বক্তব্য, গুণীজন সংবর্ধনা, স্মৃতিচারণ এবং সাংস্কৃতিক পরিবেশনার আয়োজন রাখা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠাতা হাফেজ মুহাম্মদ ইব্রাহিম (রহ.)-এর পরিবারের সদস্যরাও মাদ্রাসার উন্নয়ন, পরিচালনা ও ধর্মীয় পরিবেশ বজায় রাখতে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন।
সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, শতবর্ষের এ আয়োজন প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ, সৌহার্দ্য ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি দায়বদ্ধতা আরও সুদৃঢ় করবে। একই সঙ্গে ইসলামী শিক্ষার প্রসার, নৈতিক মূল্যবোধ গঠন এবং যোগ্য আলেম তৈরির ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ অগ্রযাত্রায় নতুন অনুপ্রেরণা জোগাবে।
