দীর্ঘ ১০০ বছরের ঐতিহ্য, গৌরব ও ইসলামী শিক্ষার ধারাবাহিকতা নিয়ে ফরিদপুরের বাকিগঞ্জ ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসার শতবর্ষ উপলক্ষে প্রথম অ্যালামনাই অনুষ্ঠান-২০২৬ আয়োজন করা হয়েছে। আগামী ২৪ অক্টোবর, শনিবার, ফরিদপুরের বাকিগঞ্জ ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে এ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। অনুষ্ঠানে প্রাক্তন শিক্ষার্থী, আমন্ত্রিত অতিথি, শিক্ষক ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের অংশগ্রহণের কথা রয়েছে। আয়োজনের অংশ হিসেবে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত, হামদ-নাত, অতিথিদের বক্তব্য, গুণীজন সংবর্ধনা, স্মৃতিচারণ ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠার ইতিহাস ও ঐতিহ্য
১৯২২ সালে বাকিগঞ্জ ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। তৎকালীন বৃহত্তর ফরিদপুরসহ পার্শ্ববর্তী মাগুরা, মানিকগঞ্জ এবং ঢাকা জেলার দোহার ও নবাবগঞ্জ এলাকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ইসলামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভাব ছিল। সে সময় সমাজে বিভিন্ন ধর্মীয় কুসংস্কার ও অনৈসলামিক কার্যকলাপ প্রচলিত ছিল। ইসলামের বিধিবিধান সম্পর্কে সাধারণ মানুষের জ্ঞান ও সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য পর্যাপ্ত আলেম ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভাবও ছিল।
এমন পরিস্থিতিতে হাফেজ মুহাম্মদ ইব্রাহিম সাহেব তাহার পীর জৌনপুরের পীর সাহেবদের নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় মাহফিল আয়োজনের মাধ্যমে ইসলামের দাওয়াত প্রচার এবং ধর্মীয় বিধিবিধান সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করার উদ্যোগ নেন। ওই সময়ের সামাজিক ও ধর্মীয় পরিস্থিতি তাঁকে একটি ইসলামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা গভীরভাবে উপলব্ধি করতে উদ্বুদ্ধ করে।
এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে তিনি দক্ষিণ চর মাধবদিয়া মৌজায় তাঁর মালিকানাধীন প্রায় ১০০ বিঘা জমির ওপর একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেন। বিষয়টি এলাকার মানুষের সঙ্গে আলোচনা করলে তাঁর উদ্যোগে ব্যাপক সাড়া পাওয়া যায়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯২২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বাকিগঞ্জ ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসা।
নামকরণের পেছনের ইতিহাস
মাদ্রাসার নামকরণ নিয়ে আলোচনার সময় এলাকার অনেকেই প্রতিষ্ঠাতা হাফেজ মুহাম্মদ ইব্রাহিম সাহেবের নামে প্রতিষ্ঠানটির নামকরণের প্রস্তাব দেন। তবে তিনি সে প্রস্তাবে সম্মতি না দিয়ে ব্রিটিশ ভারতের বিশিষ্ট ধর্মীয় সংস্কারক বাকীবিল্লাহ (রহ.)-এর নাম অনুসারে মাদ্রাসার নামকরণ করেন। পরবর্তী সময়ে ওই এলাকার নামও বাকিগঞ্জ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
প্রাথমিক পর্যায়ে হাফেজি মাদ্রাসা হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটি দাখিল, আলিম ও ফাজিল স্তরে উন্নীত হয়। দীর্ঘদিন ধরে সুনামের সঙ্গে ফাজিল শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
পরবর্তীকালে মাদ্রাসাটিকে কামিল স্তরে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। কামিল শ্রেণি খোলার বিষয়ে তৎকালীন সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট মোস্তফা মাহমুদ আরিফি সাহেবের পরামর্শক্রমে প্রিন্সিপাল মাহমুদুল হাসান এবং ভাইস প্রিন্সিপাল রেশাদুল হাকীম উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন।
অসংখ্য কৃতী শিক্ষার্থী তৈরির প্রতিষ্ঠান
প্রতিষ্ঠার পর থেকে দীর্ঘ ১০০ বছরের পথচলায় এ মাদ্রাসা থেকে হাজার হাজার শিক্ষার্থী শিক্ষা গ্রহণ করে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে পদকপ্রাপ্ত বিশিষ্ট সমাজসেবক অধ্যাপক আবদুস সামাদ এবং ফরিদপুর জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান লোকমান হোসেন মৃধাসহ অনেক কৃতী ব্যক্তি রয়েছেন।
মাদ্রাসাটি বিভিন্ন সময়ে ফরিদপুর জেলা ও সদর উপজেলার শ্রেষ্ঠ মাদ্রাসা হিসেবে পুরস্কার লাভ করেছে। দীর্ঘ পথচলায় প্রতিষ্ঠানটির প্রাঙ্গণে জাতীয় পর্যায়ের বহু নেতা ও বিশিষ্ট ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের আগমন ঘটেছে, যা এর ঐতিহ্য ও মর্যাদাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
প্রতিষ্ঠাতার পরিবারের অবদান
মাদ্রাসার উন্নয়ন, পরিচালনা ও ধর্মীয় পরিবেশ বজায় রাখতে প্রতিষ্ঠাতা হাফেজ মুহাম্মদ ইব্রাহিম সাহেবের পরিবারের সদস্যরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
ভবিষ্যৎ অগ্রযাত্রার প্রত্যাশা
বর্তমানে মাদ্রাসার যোগ্য শিক্ষকবৃন্দের আন্তরিক ও ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠানটির অগ্রযাত্রা অব্যাহত রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, ইসলামী শিক্ষা বিস্তার, নৈতিক মূল্যবোধ গঠন এবং যোগ্য আলেম তৈরির ক্ষেত্রে বাকিগঞ্জ ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসা ভবিষ্যতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
প্রতিষ্ঠাতা হাফেজ মুহাম্মদ ইব্রাহিম সাহেব যে উদ্দেশ্য ও স্বপ্ন নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলেছিলেন, তা যেন যুগ যুগ ধরে অব্যাহত থাকে—এমন প্রত্যাশা সংশ্লিষ্ট সবার। তাঁদের আশা, কেয়ামত পর্যন্ত এ মাদ্রাসা থেকে অসংখ্য আলেমে দ্বীন তৈরি হয়ে দেশ-বিদেশে ইসলামের শিক্ষা ও আদর্শ ছড়িয়ে দেবেন, ইনশাআল্লাহ।
অ্যালামনাই অনুষ্ঠানের আয়োজন
আগামী ২৪ অক্টোবর, শনিবার, ফরিদপুরের বাকিগঞ্জ ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিতব্য প্রথম অ্যালামনাই অনুষ্ঠান-২০২৬ উপলক্ষে প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও অতিথিদের মিলনমেলায় পরিণত হবে প্রতিষ্ঠানটির প্রাঙ্গণ।
অনুষ্ঠানসূচি অনুযায়ী, প্রথমে অতিথি ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের আগমন, এরপর পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত ও হামদ-নাত পরিবেশিত হবে। পরে স্বাগত বক্তব্য ও অতিথিদের বক্তব্য, গুণীজন সংবর্ধনা ও স্মৃতিচারণ অনুষ্ঠিত হবে। সবশেষে থাকবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
শতবর্ষের ঐতিহ্যকে ধারণ করে এ আয়োজন প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ, সৌহার্দ্য ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি দায়বদ্ধতা আরও সুদৃঢ় করবে বলে প্রত্যাশা আয়োজকদের।
