তোমরা টাকা দিয়ে মার্সিডিজ কিনো, আর আমি শিক্ষায় বিনিয়োগ করব—সহকর্মীদের উদ্দেশ্যে এমন কথাই বলেছিলেন নাভি পিল্লাই। ২০২৬ সালে এসে সেই বিনিয়োগই যেন শান্তিতে নোবেল পুরস্কার হয়ে ফিরে আসল।
১৯৪১ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে তামিল পরিবারে জন্ম নাভানেথেম ‘নাভি’ পিল্লাইয়ের । শৈশব কেটেছে দারিদ্র্য ও বর্ণবাদী বৈষম্যের মধ্যে। বাবা ছিলেন বাসচালক। উগ্র বর্ণবাদী ‘অ্যাপার্থাইড’ শাসনের সামাজিক বাধা পেরিয়ে নাটাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন পাস করেন পিল্লাই। ১৯৬৭ সালে নাটালের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী আইনজীবী হিসেবে প্র্যাকটিস শুরু করেন।
আইন পেশায় বড় আয়ের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সবাইকে চমকে দিয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য হার্ভার্ডে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। সহকর্মীরা যখন প্রশ্ন তুলেছিলেন নতুন ডিগ্রি নিলে তো আর মক্কেলদের থেকে বেশি ফি পাওয়া যাবে না! তখন পিল্লাই বলেছিলেন, ‘তোমরা টাকা দিয়ে মার্সিডিজ বেঞ্জ কিনো, আমি বরং শিক্ষায় বিনিয়োগ করি।’
১৯৮৮ সালে হার্ভার্ড ল স্কুল থেকে ডক্টর অব জুরিডিক্যাল সায়েন্স (এসজেডি) ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। প্রথম দক্ষিণ আফ্রিকান হিসেবে এই ডিগ্রি নিয়ে ইতিহাস গড়েন পিল্লাই।
বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার রক্ষা এবং আন্তর্জাতিক আইন সমুন্নত রাখার লড়াইয়ে অবিচল তিনি। যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার সঙ্গে জড়িতদের জবাবদিহিতার স্বীকৃতিতে তাঁকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়।
আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতসহ বহুপাক্ষিক ব্যবস্থা রাজনৈতিক চাপে কার্যকারিতা হারাচ্ছে। এমন সময়ে নাভি পিল্লাইয়ের নোবেল প্রাপ্তিকে আন্তর্জাতিক আইনের শাসনের পক্ষে প্রতিরক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল ইস্যুতে নাভি পিল্লাইয়ের ভূমিকা তাৎপর্যপূর্ণ ও প্রভাবশালী। ২০২১ সালে প্রতিষ্ঠিত জাতিসংঘের ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল বিষয়ক স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের সংঘাতের পর তাঁর নেতৃত্বাধীন তদন্ত কমিশন উভয় পক্ষের অপরাধ তদন্ত করে।
কমিশন গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান ও অবরুদ্ধ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে। কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, গাজায় পানি, জ্বালানি ও চিকিৎসা সামগ্রী আটকে রেখে নির্মম পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে। বেঁচে থাকার মৌলিক উপাদানকে ইসরায়েল অস্ত্র বানাচ্ছে—এই নির্মম চিত্র উন্মোচন করে পিল্লাই নেতৃত্বাধীন কমিশন।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে জানায়, ইসরায়েলের সামরিক অভিযান আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী গণহত্যা। মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই রিপোর্টের আইনি সততার প্রশংসা করলেও ইসরায়েল ও পশ্চিমা দেশগুলো এই তদন্তের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তোলে।
পিল্লাইয়ের নোবেল জয়ে তাই ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইসরায়েল। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নোবেল কমিটি একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় মিথ্যাকে পুরস্কৃত করেছে।
নাভি পিল্লাইয়ের আইনি দর্শনের মূলে রয়েছে বিচারহীনতার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে অবস্থান। ইন্টারন্যাশনাল নুরেমবার্গ প্রিন্সিপালস একাডেমির স্মৃতিচারণে পিল্লাই বলেন, এমন অনেক কিছু আছে যা একটি দেশের আইনে বৈধ, তবে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে অপরাধ। আমাদের মনে রাখতে হবে, দেশের সরকারপ্রধানও এই আন্তর্জাতিক আইনের ঊর্ধ্বে নন। দেশের আদালত যখন সাধারণ মানুষকে সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়, তখন বৈশ্বিক আদালতই ভুক্তভোগীদের আশ্রয়স্থল।
বর্তমান বহুপাক্ষিক বিশ্বব্যবস্থার দ্বিমুখী নীতি ও ভণ্ডামি নিয়ে বরাবরই কঠোর সমালোচনা করেছেন নাভি পিল্লাই। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী তিন সদস্য যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীন কেন আজ পর্যন্ত আইসিসির রোম সংবিধিতে সই করেনি—তা নিয়ে বারবার প্রশ্ন তুলেছেন।
পশ্চিমা দেশগুলোর কোভিড টিকা মজুত ও আঞ্চলিক যুদ্ধে দ্বিমুখী আচরণের সমালোচনা করেছেন তিনি। এসব কারণে অনুন্নত বিশ্বের তরুণরা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারাচ্ছে বলে মনে করেন পিল্লাই।
রুয়ান্ডা ট্রাইব্যুনাল ও জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। তিনি বলেছেন, ‘অন্যায় রুখতে প্রথাগত শান্ত পরিবেশ ভাঙতে হবে, অন্যথায় মানুষ শোষণকেই সাধারণ নিয়ম মানবে।’
নেলসন ম্যান্ডেলার উক্তির কথা স্মরণ করিয়ে পিল্লাই বলেন, সুবিধাজনক অবস্থান থেকে ন্যায়বিচার হয় না। এটি আসে সাধারণ মানুষ, তৃণমূলের কর্মী এর সম্মিলিত প্রতিরোধে।
তথ্যসূত্র: ইকনোমিক টাইমস, বিবিসি এবং দ্য গার্ডিয়ান
