তুরস্কের ইস্তাম্বুলের বেশ কিছু গ্রামের বাসিন্দারা কয়েক বছর ধরে রাতের বেলায় তীব্র দুর্গন্ধে ভুগছেন। গরমের রাতেও অনেক সময় জানালা বন্ধ করে ঘুমাতে হয় তাঁদের। দুর্গন্ধের উৎস হিসেবে তাঁরা চিহ্নিত করেছেন শহরের সিলিভরি পৌর বর্জ্যভূমিকে। সেখানে খাবার ও অন্যান্য জৈব বর্জ্য পচে তৈরি হচ্ছে বিপুল পরিমাণ গ্যাস।
তবে এই গ্যাস শুধু স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য দুর্ভোগের কারণ নয়। এর মধ্যে রয়েছে মিথেন, যা শক্তিশালী জলবায়ু উষ্ণকারী গ্যাস। স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, সিলিভরি বর্জ্যভূমি থেকে এত বিপুল পরিমাণ মিথেন বের হচ্ছে যে এর নিঃসরণ মহাকাশ থেকেও শনাক্ত করা যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, লস অ্যাঞ্জেলেসের (ইউসিএলএ) গবেষকদের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সিলিভরি তুরস্কের সবচেয়ে বড় ‘সুপার-এমিটার’ বর্জ্যভূমি। এখান থেকে ঘণ্টায় গড়ে ৭ দশমিক ৪ টন মিথেন নিঃসৃত হচ্ছে। গবেষকদের হিসাবে, এর জলবায়ু উষ্ণ করার প্রভাব প্রায় ১৫ লাখ বেশি জ্বালানি খরচকারী গাড়ির একসঙ্গে ইঞ্জিন চালানোর সমান।
বিষয়টি তুরস্কের জন্য বিব্রতকর হয়ে উঠেছে। কারণ আগামী নভেম্বরে দেশটিই জাতিসংঘের বৈশ্বিক জলবায়ু সম্মেলন কপ৩১-এর আয়োজন করতে যাচ্ছে। সম্মেলনে মিথেন নিঃসরণ কমানোকে নিজেদের কর্মসূচির অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরছে তুরস্ক।
দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ স্থানীয়রা
সিলিভরি বর্জ্যভূমির কাছের ইয়োলচাতি গ্রামের বাসিন্দা কেমালেত্তিন ওজেনচ বলেন, দুর্গন্ধ এতটাই তীব্র যে তা সহ্য করা কঠিন।
তিনি বলেন, বাতাস স্থির থাকলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। গরমের রাতেও অনেক পরিবারকে জানালা বন্ধ করে রাখতে হয়।
বছরের পর বছর এই সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করলেও স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকে কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করতে ভয় পান। ওজেনচ জানান, বর্জ্যভূমির দুর্গন্ধ নিয়ে অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি একটি আবেদনেও স্থানীয়দের স্বাক্ষর নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত অনেকে কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলতে ভয় পাওয়ায় সেই উদ্যোগ এগোয়নি।
স্যাটেলাইটে ধরা পড়ছে মিথেনের বিশাল মেঘ
মিথেন গ্যাস স্বচ্ছ হওয়ায় খালি চোখে এর নিঃসরণ দেখা যায় না। তবে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে এর বিশাল বিস্তার শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে।
কার্বন ম্যাপার নামের একটি তথ্যভান্ডারের স্যাটেলাইট তথ্য ব্যবহার করে তুরস্কের ১০টি সবচেয়ে বেশি মিথেন নিঃসরণকারী বর্জ্যভূমি চিহ্নিত করেছে ইউসিএলএ। সিলিভরি ছাড়াও ইস্তাম্বুলের শিলে এলাকার একটি বর্জ্যভূমি থেকে ঘণ্টায় প্রায় ৪ টন মিথেন বের হচ্ছে। এর জলবায়ুগত প্রভাব প্রায় ৮ লাখ বেশি জ্বালানি খরচকারী গাড়ির সমান বলে গবেষকদের হিসাব।
ইউসিএলএর স্টপ মিথেন প্রকল্পের প্রধান কারা হোরোভিৎস বলেন, তুরস্কের অনেক বর্জ্যভূমি থেকে যে পরিমাণ মিথেন বের হচ্ছে, তা বৈশ্বিক হিসাবেও অত্যন্ত বড়। এসব স্থাপনা বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানবসৃষ্ট মিথেন নিঃসরণকারীদের মধ্যে পড়তে পারে বলে জানান তিনি।
সম্মেলনে মিথেন কমানোর অঙ্গীকার
তুরস্ক আগামী নভেম্বরে আন্তালিয়ায় কপ৩১ আয়োজন করবে। দেশটির পরিবেশমন্ত্রী ও কপ৩১-এর মনোনীত সভাপতি মুরাত কুরুম সম্মেলনে অংশ নিতে যাওয়া ১৯৬টি দেশের উদ্দেশে লেখা এক চিঠিতে বলেছেন, স্বল্পমেয়াদে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি কমানোর সবচেয়ে দ্রুত ও কার্যকর উপায়গুলোর একটি হলো মিথেন নিঃসরণ কমানো।
বর্জ্য খাতকে এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবেও উল্লেখ করেছেন তিনি।
তুরস্কের ফার্স্ট লেডি এমিনে এরদোয়ানও ‘জিরো ওয়েস্ট’ বা শূন্য বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রচার চালিয়ে আসছেন। তিনি তুরস্কের জিরো ওয়েস্ট ফাউন্ডেশনের সম্মানসূচক সভাপতি এবং জাতিসংঘের জিরো ওয়েস্টবিষয়ক উপদেষ্টা বোর্ডের চেয়ারপার্সন।
তবে গার্ডিয়ানের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলেও তুরস্কের পরিবেশ মন্ত্রণালয় দেশটির মিথেন নিঃসরণকারী বর্জ্যভূমিগুলো নিয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। ইস্তাম্বুলের পৌর কর্তৃপক্ষও সিলিভরি থেকে মিথেন নিঃসরণ নিয়ে প্রশ্নের জবাব দেয়নি।
আরেকটি বিষয়ও সামনে এসেছে। তুরস্ক বিশ্বের ১৫৯টি দেশের সঙ্গে মিলে ২০৩০ সালের মধ্যে মিথেন নিঃসরণ ৩০ শতাংশ কমানোর ‘গ্লোবাল মিথেন প্লেজ’-এ এখনো স্বাক্ষর করেনি।
মিথেন ধরেও পুরোপুরি ঠেকানো যাচ্ছে না
সিলিভরি তুরস্কের সবচেয়ে বড় বর্জ্যভূমি। সেখানে প্রতিদিন প্রায় ১০ হাজার টন বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করা হয়।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ইস্তাচের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্জ্যভূমির যেসব অংশ এখনো কাদামাটি দিয়ে পুরোপুরি ঢেকে দেওয়া হয়নি, সেখান থেকেই মূলত গ্যাস বের হওয়ার ঘটনা ঘটছে। তাঁদের দাবি, এসব জায়গা দ্রুত ঢেকে দিয়ে মিথেন সংগ্রহ করে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা চলছে।
সিলিভরিতে ঘণ্টায় প্রায় ৬ হাজার ঘনমিটার মিথেন সংগ্রহ করে তা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্যাস সংগ্রহের ব্যবস্থা থাকলেই সব মিথেন আটকানো সম্ভব হয় না।
কার্বন ম্যাপারের বর্জ্য খাতের প্রধান ড. টিয়া স্কারপেল্লির মতে, গ্যাস সংগ্রহ ব্যবস্থার নকশা, দক্ষতা এবং প্রতিদিনের ব্যবস্থাপনার ওপর এর কার্যকারিতা নির্ভর করে। যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি, অতিরিক্ত মিথেন পোড়ানোর ব্যবস্থা ঠিকমতো কাজ না করা কিংবা শুধু ভালো মানের গ্যাস সংগ্রহ করে বাকি গ্যাস বাইরে ছেড়ে দেওয়ার মতো কারণেও বড় ধরনের নিঃসরণ হতে পারে।
জৈব বর্জ্য ভাগাড়ে না ফেলাই সমাধান
বিশেষজ্ঞদের মতে, মিথেন নিঃসরণ কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো জৈব বর্জ্যকে ভাগাড়ে ফেলা বন্ধ করা। কারণ খাবারসহ জৈব বর্জ্য ভাগাড়ে গিয়ে পচতে থাকলেই বিপুল পরিমাণ মিথেন তৈরি হয়।
দক্ষিণ কোরিয়া এর একটি উদাহরণ। দেশটিতে উৎপাদিত খাদ্যবর্জ্যের প্রায় ১০০ শতাংশই পুনর্ব্যবহার করা হচ্ছে।
কারা হোরোভিৎস বলেন, বর্জ্য থেকে মিথেন বের হওয়ার পর তা আটকানোর চেয়ে বর্জ্যই যাতে ভাগাড়ে গিয়ে না পচে, সেই ব্যবস্থা করা আরও কার্যকর।
বিশ্বব্যাপী উষ্ণায়নের প্রায় এক-চতুর্থাংশের জন্য মিথেন দায়ী বলে বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন। কার্বন ডাই-অক্সাইডের তুলনায় বায়ুমণ্ডলে মিথেনের স্থায়িত্ব কম হলেও স্বল্পমেয়াদে এটি অনেক বেশি শক্তিশালী উষ্ণকারী গ্যাস। ফলে মিথেন নিঃসরণ কমানোকে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
তুরস্কের ক্ষেত্রে বিষয়টি শুধু পরিবেশগত নয়, রাজনৈতিকও হয়ে উঠেছে। ইস্তাম্বুল, আঙ্কারা ও ইজমিরসহ কয়েকটি বড় শহর এখনো বিরোধী দলের নিয়ন্ত্রণে। একই সময়ে দেশটির সবচেয়ে বড় বিরোধী দলের ওপর সরকারি চাপ ও দমন-পীড়নের অভিযোগ রয়েছে।
ইস্তাম্বুলের মেয়র একরেম ইমামোগ্লুসহ পৌরসভার কয়েক শ সাবেক কর্মী দুর্নীতির অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি। এর মধ্যেই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিরোধী দলের সক্ষমতা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক চলছে।
অন্যদিকে সিলিভরি এলাকার বাসিন্দা ওজেনচদের অভিযোগ, বছরের পর বছর দুর্গন্ধে ভোগার পরও তাঁদের সমস্যার কার্যকর সমাধান হয়নি।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
