ডিজিটাল আর্থিক লেনদেনের বিস্তার, ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর সাইবার হামলার ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় আর্থিক খাতের তদারকি জোরদার, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংস্থাটি।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের কুইন সিরিকিত ন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে (কিউএসএনসিসি) আইএমএফের ‘ফিউচার অব ফিন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি অ্যাসেসমেন্ট’ শীর্ষক এক সেমিনারে এসব বিষয় তুলে ধরা হয়।
সেমিনারে আলোচকেরা বলেন, ডিজিটাল লেনদেনের পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আর্থিক খাতের ঝুঁকিও বাড়ছে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর সাইবার হামলা, প্রযুক্তিগত দুর্বলতা এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পারস্পরিক নির্ভরশীলতা আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। এসব ঝুঁকি সময়মতো শনাক্ত ও মোকাবিলা করতে না পারলে তা পুরো আর্থিক ব্যবস্থায় ছড়িয়ে পড়তে পারে।
গ্রিসের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ক্রিস্টিনা পাপাকনস্টান্টিনু এআই-সংশ্লিষ্ট সাইবার ঝুঁকি মোকাবিলায় সতর্কতা অবলম্বনের ওপর গুরুত্ব দেন। একই সঙ্গে আর্থিক প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে নাগরিকদের চাহিদা ও প্রয়োজন বিবেচনায় নেওয়ার বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি।
আইএমএফের ডেপুটি ডিরেক্টর মিকেলা এরবেনোভা বলেন, ডিজিটাল লেনদেনের পরিমাণ বৃদ্ধি এবং আর্থিক ব্যবস্থার বিভিন্ন অংশের পারস্পরিক নির্ভরশীলতা নতুন ধরনের দুর্বলতা তৈরি করছে। তাই আর্থিক খাতের উন্নয়নের পাশাপাশি ঝুঁকি শনাক্ত ও মোকাবিলার সক্ষমতাও বাড়াতে হবে।
তিনি আরও বলেন, আর্থিক খাতের সম্ভাব্য সংকট আগেভাগে শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় সংস্কার করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা ও নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে। পাশাপাশি প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তদারককারী সংস্থাগুলোর দক্ষতা ও সক্ষমতা উন্নত করা প্রয়োজন।
সেমিনারে আর্থিক খাতের বিদ্যমান নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, প্রতিবেদন তৈরির মানদণ্ড এবং মূলধনসংক্রান্ত বিধিবিধান নতুন ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলায় কতটা কার্যকর, তা পর্যালোচনার সুপারিশ করা হয়। আন্তর্জাতিক মান অনুসরণের পাশাপাশি প্রতিটি দেশের আর্থসামাজিক পরিস্থিতি এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা বিবেচনায় নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
আর্থিক খাতের ঝুঁকি মূল্যায়নে আইএমএফের অন্যতম প্রধান উদ্যোগ হলো ফিন্যান্সিয়াল সেক্টর অ্যাসেসমেন্ট প্রোগ্রাম (এফএসএপি)। দুই দশকের বেশি সময় ধরে চালু থাকা এ কর্মসূচির মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের আর্থিক ব্যবস্থার দুর্বলতা শনাক্ত, তদারকি ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার কার্যকারিতা মূল্যায়ন এবং সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলার প্রস্তুতি পর্যালোচনা করা হয়।
দ্রুত পরিবর্তনশীল আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে ২০২৬ সালের এফএসএপি পর্যালোচনায় বেশ কিছু সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর লক্ষ্য হলো ঝুঁকির ধরন অনুযায়ী মূল্যায়ন আরও কার্যকর করা, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পারস্পরিক সংযোগ থেকে সৃষ্ট ঝুঁকি শনাক্ত করা এবং বাস্তবসম্মত সুপারিশ দেওয়া। একই সঙ্গে মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রয়োজন অনুযায়ী গভীর ও লক্ষ্যভিত্তিক মূল্যায়ন, বিশ্লেষণপদ্ধতিতে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ এবং সক্ষমতা উন্নয়ন কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের বিষয়গুলো আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে। পাশাপাশি মূল্যায়ন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার এবং স্বেচ্ছামূলক মূল্যায়নের সুযোগ সহজ করার বিষয়টিও বিবেচনায় এসেছে।
বাংলাদেশের মতো দ্রুত ডিজিটাল আর্থিক সেবা সম্প্রসারণশীল দেশের জন্যও এসব সতর্কবার্তা গুরুত্বপূর্ণ। মোবাইল আর্থিক সেবা, ডিজিটাল ব্যাংকিং এবং ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তা, তথ্যের সুরক্ষা এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় উঠে আসা সুপারিশগুলোর আলোকে বাংলাদেশের আর্থিক খাতে ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ, নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধি এবং ব্যাংক ও ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ঝুঁকি ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে সমন্বিত তদারকি জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। প্রযুক্তিনির্ভর আর্থিক সেবার সুফল ধরে রাখতে উদ্ভাবনের পাশাপাশি নিরাপত্তা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাও জরুরি।
