PRB Post

২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৬:০৮ PM • অন্যান্য

বাংলাদেশের পর্যটনে অপার সম্ভাবনা, প্রয়োজন বিনিয়োগ ও পর্যটনবান্ধব মানসিকতা

PRB Post

২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ৬:০৮ PM • 5 মিনিট পড়া
আপডেট: ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ৮:৫৭ PM

অনলাইন প্রতিবেদক

বাংলাদেশের পর্যটনে অপার সম্ভাবনা, প্রয়োজন বিনিয়োগ ও পর্যটনবান্ধব মানসিকতা

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সমুদ্র, পাহাড়, নদী, ম্যানগ্রোভ বন, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও সমৃদ্ধ ইতিহাস-ঐতিহ্যে বাংলাদেশের পর্যটন খাতে রয়েছে বিপুল সম্ভাবনা। কক্সবাজারের দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত থেকে শুরু করে সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বন, পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি অঞ্চল কিংবা মহাস্থানগড় ও পাহাড়পুরের মতো ঐতিহাসিক স্থাপনা-বৈচিত্র্যময় পর্যটন আকর্ষণের দিক থেকে বাংলাদেশ অনেক সম্ভাবনাময় হলেও বৈশ্বিক পর্যটন মানচিত্রে এখনো কাঙ্ক্ষিত অবস্থান তৈরি করতে পারেনি।

বিশ্ব পর্যটন দিবস উপলক্ষে এটিএন নিউজ আয়োজিত বিশেষ অনুষ্ঠান ‘বাংলাদেশের পর্যটন: সম্ভাবনা, বিনিয়োগ ও আগামীর পথচলা’ শীর্ষক আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেন। ছুটি রিসোর্ট লিমিটেডের নিবেদনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে পর্যটন খাতের সম্ভাবনা, বিনিয়োগের সুযোগ, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি এবং পর্যটনবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়।

অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শামসুজ্জামান এবং ছুটি রিসোর্ট লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও ছুটি গ্রুপের কো-ফাউন্ডার অ্যাডভোকেট মোস্তফা মাহমুদ আরিফি।

জিডিপিতে পর্যটনের অবদান বাড়ানোর সুযোগ

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পর্যটন খাতের অবদান এখনো তুলনামূলকভাবে কম বলে অনুষ্ঠানে উল্লেখ করেন বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শামসুজ্জামান। তার মতে, বর্তমানে দেশের জিডিপিতে পর্যটন খাতের অবদান প্রায় ২ থেকে ৩ শতাংশের মধ্যে। অন্যদিকে শ্রীলঙ্কার মতো পর্যটননির্ভর দেশে এই অবদান প্রায় ১০ শতাংশের কাছাকাছি বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, পর্যটন খাতকে আরও কার্যকরভাবে বিকশিত করা গেলে দেশের অর্থনীতিতে এর অবদান উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। এজন্য সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করা প্রয়োজন।

তিনি জানান, পর্যটন খাতকে বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের অধীন হোটেল ও মোটেলগুলোর সেবার মান উন্নয়ন এবং নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

পিপিপিতে নতুন বিনিয়োগের উদ্যোগ

পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়নে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব বা পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (চচচ) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে অনুষ্ঠানে তুলে ধরা হয়।

মোহাম্মদ শামসুজ্জামান জানান, পিপিপির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানের বিনোদনকেন্দ্র ও হোটেল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে কক্সবাজারের শৈবাল হোটেলসহ পর্যটন কর্পোরেশনের বিভিন্ন ইউনিট বেসরকারি খাতের সহযোগিতায় পরিচালনার বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কুয়াকাটায় কেবলকার চালুর সম্ভাবনা নিয়েও দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলে জানান তিনি। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে পর্যটকদের জন্য নতুন আকর্ষণ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট এলাকায় স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকা- বাড়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

প্রকৃতির বৈচিত্র্য বড় সম্পদ

বেসরকারি খাতের দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের পর্যটন সম্ভাবনা তুলে ধরে ছুটি রিসোর্ট লিমিটেডের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মোস্তফা মাহমুদ আরিফি বলেন, ভৌগোলিক আয়তন তুলনামূলক ছোট হলেও বাংলাদেশের প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য পর্যটনের জন্য একটি বড় সম্পদ।

তার মতে, কক্সবাজার, কুয়াকাটা, রাঙামাটি, বান্দরবান ও সুন্দরবনের মতো প্রাকৃতিক পর্যটনকেন্দ্রের পাশাপাশি মহাস্থানগড়, পাহাড়পুরসহ ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মিক স্থানগুলোকে সমন্বিতভাবে পর্যটন পরিকল্পনার আওতায় আনা গেলে এ খাতের ব্যাপক সম্প্রসারণ সম্ভব।

তিনি বলেন, শুধু নির্দিষ্ট কয়েকটি পর্যটনকেন্দ্রকে ঘিরে পর্যটন শিল্প গড়ে তুললে সম্ভাবনার পূর্ণ ব্যবহার সম্ভব হবে না। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রাকৃতিক, ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে একসঙ্গে তুলে ধরতে হবে।

বিনিয়োগে প্রয়োজন সহজ অর্থায়ন

পর্যটন খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে উদ্যোক্তাদের জন্য অনুকূল অর্থনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন মোস্তফা মাহমুদ আরিফি।

তার মতে, পর্যটন ব্যবসায়ীদের জন্য স্বল্পসুদের ঋণ ও বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। পর্যটন অবকাঠামো নির্মাণ, হোটেল, রিসোর্ট, বিনোদনকেন্দ্র ও অন্যান্য পর্যটনসেবা গড়ে তুলতে বড় অঙ্কের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ প্রয়োজন হয়। ফলে উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ।
এর পাশাপাশি দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখাকেও বিনিয়োগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।

শুধু অবকাঠামো নয়, বদলাতে হবে মানসিকতা

পর্যটন খাতের উন্নয়নে রাস্তা, হোটেল, বিনোদনকেন্দ্র কিংবা যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নের পাশাপাশি পর্যটকদের প্রতি সাধারণ মানুষের আচরণ ও সেবার মান উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তার কথাও অনুষ্ঠানে গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসে।
বক্তারা বলেন, পর্যটকদের অতিথি হিসেবে বিবেচনা করে আন্তরিকভাবে সেবা দেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তাদের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ পর্যটন শিল্পের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

পর্যটনবান্ধব মানসিকতা শুধু ব্যবসায়ী বা সরকারি সংস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সাধারণ মানুষের মধ্যেও তৈরি করতে হবে। স্থানীয় জনগোষ্ঠী পর্যটনের সুফল পেলে তারা পর্যটনসম্পদ সংরক্ষণ ও পর্যটকদের সহযোগিতায় আরও আগ্রহী হবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে প্রশিক্ষণ

পর্যটন খাত সম্প্রসারণের সঙ্গে দক্ষ জনশক্তির চাহিদাও বাড়বে। এ কারণে মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন অনুষ্ঠানের বক্তারা।

বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান জানান, ন্যাশনাল হোটেল অ্যান্ড টুরিজম ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে হাজার হাজার তরুণ-তরুণীকে বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এসব প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দেশের পর্যটন ও হোটেল খাতের জন্য দক্ষ কর্মী তৈরির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারেও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে।
সৌদি আরব ও সিঙ্গাপুরের মতো দেশের শ্রমবাজারে প্রশিক্ষিত কর্মীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

এতে পর্যটন খাতকে শুধু দেশের অভ্যন্তরে কর্মসংস্থানের উৎস হিসেবে নয়, দক্ষ জনশক্তি তৈরির মাধ্যমে বৈদেশিক কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র হিসেবেও বিবেচনা করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

ছোটবেলা থেকেই পর্যটন সচেতনতা

পর্যটনবান্ধব সমাজ গঠনে শিশুদের মধ্যে ছোটবেলা থেকেই পর্যটন সচেতনতা তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন উদ্যোক্তা মোস্তফা মাহমুদ আরিফি। তার মতে, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থার পাশাপাশি শিশুদের মধ্যে পর্যটনসম্পদ সংরক্ষণ, পরিবেশ রক্ষা, পর্যটকদের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ এবং নৈতিক মানদ- সম্পর্কে ধারণা তৈরি করা প্রয়োজন।
পর্যটনকেন্দ্রে ময়লা না ফেলা, প্রাকৃতিক ও ঐতিহাসিক সম্পদ নষ্ট না করা, স্থানীয় সংস্কৃতির প্রতি সম্মান দেখানো এবং পর্যটকদের নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্যের বিষয়টি বিবেচনায় রাখার মতো আচরণগুলো ছোটবেলা থেকেই শেখানো যেতে পারে।

কর্মসংস্থানের বড় ক্ষেত্র হতে পারে পর্যটন

পর্যটন শিল্পের বিস্তারের সঙ্গে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। হোটেল-রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, ট্যুর অপারেটর, গাইড, বিনোদনকেন্দ্র, হস্তশিল্প, স্থানীয় পণ্য এবং অন্যান্য সেবাখাতে পর্যটনকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকা- বাড়তে পারে।

বিশেষ করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পর্যটন অবকাঠামো গড়ে উঠলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য নতুন আয়ের সুযোগ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। নারী ও তরুণদের জন্যও পর্যটন খাত নতুন কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে এ সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে পর্যটনকেন্দ্রগুলোর যোগাযোগব্যবস্থা, নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা, আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, তথ্যসেবা এবং ডিজিটাল সুবিধার উন্নয়ন প্রয়োজন।

সরকারি-বেসরকারি সমন্বয়ই মূল চাবিকাঠি

অনুষ্ঠানের আলোচনায় একটি বিষয় স্পষ্টভাবে উঠে আসে-পর্যটন খাতের পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে শুধু সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। একই সঙ্গে শুধু বেসরকারি বিনিয়োগ দিয়েও কাক্সিক্ষত পরিবর্তন আনা কঠিন। সরকারি নীতি সহায়তা, অবকাঠামো ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোর সঙ্গে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ, ব্যবস্থাপনা ও উদ্ভাবনী উদ্যোগের সমন্বয় প্রয়োজন।

বাংলাদেশের পর্যটন খাতকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরতে কার্যকর প্রচারণা, মানসম্মত সেবা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং পর্যটনসম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনার ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।

সব মিলিয়ে সমুদ্র, পাহাড়, বন, নদী, ইতিহাস ও সংস্কৃতির বৈচিত্র্য বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের জন্য বড় সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। এই সম্ভাবনাকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানে রূপান্তর করতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, বিনিয়োগ, দক্ষ মানবসম্পদ, নিরাপদ পরিবেশ এবং পর্যটনবান্ধব সামাজিক সংস্কৃতি।

সরকার ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগের পাশাপাশি দেশের প্রতিটি নাগরিক পর্যটনসম্পদের প্রতি দায়িত্বশীল হলে বাংলাদেশকে একটি শক্তিশালী পর্যটন গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ আরও বাড়বে।


 

আরও পড়ুন